মিলাদুন্নবী নিয়ে কোরআন ও হাদীছের অপব্যাখ্যা এবং তার জবাব

❀মিলাদুন্নবী নিয়ে কোরআন ও হাদীছের অপব্যাখ্যা এবং তার জবাব❀

মীলাদুন্নবী উদযাপনকারীগণ কিছু সংশয় আঁকড়ে ধরেছেন এবং কিছু দলীল দিয়েছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:
১. আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
﴿ قُلۡ بِفَضۡلِ ٱللَّهِ وَبِرَحۡمَتِهِۦ فَبِذَٰلِكَ فَلۡيَفۡرَحُواْ هُوَ خَيۡرٞ مِّمَّا يَجۡمَعُونَ ٥٨ ﴾ [يونس: ٥٨]
“বলুন, ‘এটা আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায়; কাজেই এতে তারা যেন আনন্দিত হয়।’ তারা যা পুঞ্জীভূত করে তার চেয়ে এটা উত্তম।” [ইউনুস: ৫৮]
তারা বলে: আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তার রহমতের কারণে আনন্দিত হতে বলেছেন আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বোৎকৃষ্ট রহমত কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧ ﴾ [الانبياء: ١٠٧]
“আর আমরা তো আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য শুধু রহমতরূপেই পাঠিয়েছি।” [আম্বিয়া: ১০৭]
জবাব:
তাদের এ আয়াতের দ্বারা দলীল দেওয়াটা অনুপযুক্ত স্থানে দলীল প্রদান হয়েছে, আয়াতকে তার মূল অর্থ ছাড়া অন্য অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, আর এমন এক দিক বুঝানো হয়েছে যে দিক আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি, সর্বোত্তম আল্লাহর কথা অনুধাবনকারী এবং সর্বোত্তম কুরআনের নস বা ভাষ্য উপলব্ধি করতে পারেন এমন ব্যক্তির দ্বারাও এ দিক প্রমাণিত হয় নি। আর এর মাধ্যমে উত্তম যুগের মানুষ ও সলফে সালেহীনের বুঝ থেকে কুরআনের অর্থ গ্রহণ করা ও উদ্ভাবন করায় শরীয়তের যে পদ্ধতি রয়েছে তার বিরোধিতা করা হয়। ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন যে, এই আয়াতের মর্মার্থে সালাফে সালেহীনের মত হলো, আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া হলো তার কুরআন ও সুন্নাহ।

২. বুখারী ও মুসলিমে এসেছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি মদিনায় আসলেন এবং দেখলেন যে, ইহুদীরা আশুরার (মহররমের দশ তারিখ) দিন সাওম পালন করে; তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা উত্তর দিলো, এ দিনে আল্লাহ ফিরআউনকে ডুবিয়ে দিয়েছেন এবং মুসা আলাইহিস সালামকে উদ্ধার করেছেন তাই আমরা এ দিন আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করার জন্য সাওম পালন করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ»
“মুসার (বেঁচে যাওয়াতে আনন্দিত হওয়ার) ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমি বেশি হকদার।”
অতঃপর তিনি এ দিন সাওম পালন করতেন এবং সাওম পালন করতে আদেশ দিতেন।
তারা বলে, এ দিন রহমতের নবীর প্রকাশ ঘটার চেয়ে আর কোন নেয়ামত বড় হতে পারে? তাই আমাদের উচিত এ দিন উদযাপনের মাধ্যমে আল্লাহর নেআমতের জন্য তাঁর শুকরিয়া জ্ঞাপন করা।
জবাব:
আশুরার দিন সাওম পালনের এই হাদীস দ্বারা দলীল দেওয়াটা অকার্যকর দলীল এবং ভ্রান্ত অনুমান। কেননা আমরাও এই নবীকে প্রেরণের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করি, তবে তার জন্মে নয়; একই সাথে এটাও উল্লেখযোগ্য, আশুরার দিনের সাওম মুস্তাফা আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালামের সুন্নত হিসেবে চালু ও পছন্দনীয় করা হয়েছে। আর তিনি আমাদেরকে তার সুন্নতে তার জন্মদিনে উৎসব পালন করার প্রথা চালু করেন নি।

৩. ইমাম বায়হাকী সাহাবী আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুয়ত লাভের পর আকীকা করেছেন। অথচ তাঁর দাদা তাঁর জন্মের সপ্তম দিনে আকীকা করেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আকীকার এই পুনরাবৃত্তি করাই প্রমাণ করে যে তিনি এটা করেছেন আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য যে তিনি তাঁকে সষ্টিকূলের জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করেছেন। আর এ শোকরিয়া জ্ঞাপন তার উম্মতের জন্য প্রচলন করা হয়েছে যেন পরবর্তীরা এটাকে সুন্নতরূপে গ্রহণ করে।
জবাব:
এই হাদীসটিকে ইমাম মালেক বাতিল হাদীসসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন যেমনটি ইবন রুশদ তার থেকে বর্ণনা করেছেন ‘আল-মুকাদ্দামাতুল মুমাহ্‌হাদাত’ গ্রন্থের ‘কিতাবুল আকীকা’ অধ্যায়ে। তাছাড়া এর বর্ণনাকারী আব্দুল্লাহ ইবনুল মুহাওয়ির-এর দুর্বলতার বিষয়টি ইমাম আব্দুর রাযযাক ও ইমাম আবু দাউদ ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া একই মত পোষণ করেছেন ইমাম ইবন হিব্বান, বায্‌যার প্রমুখ। তাছাড়া যদি ধরেও নেওয়া হয় যে বর্ণনাটি বিশুদ্ধ তারপরও তাতে মিলাদুন্নবী উদযাপনের কোনো দলীল নেই।

৪. আবু লাহাবের দাসী সুয়াইবিয়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের সুসংবাদ দেওয়ায় আবু লাহাব মুক্ত তাকে করে দিয়েছিল, পরবতীতে সে সুয়াইবিয়া নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালামকে দুধপান করিয়েছিলেন। উরওয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আবু লাহাবকে কেউ স্বপ্নে দেখে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, সে তো জাহান্নামে গেছে, তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের সুসংবাদ দেওয়ায় সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দেবার কারণে প্রতি সোমবার রাতে তার শাস্তি কমানো হয়।
তারা বলে, এটি যদি আবু লাহাবের ক্ষেত্রে হয় অথচ সে জাহান্নামবাসী কাফের; তাহলে ঐ তৌহিদবাদী মুসলিমের কী অবস্থা হবে যে নবীর জন্মে খুশি হয় এবং তার সাধ্যানুযায়ী শ্রম ব্যয় করে।
জবাব:
· এই হাদীসটি মুরসাল হাদীস যেরূপ ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন এবং হাফেয ইবন হাজার তার ফাত্‌হুল বারী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
· এছাড়াও এটি একটি স্বপ্ন যা কোনো প্রমাণ নয়।
· আর এটি কুরআনের সরাসরি বিপরীত কথা, কারণ কুরআনের এসেছে, আখেরাতে কাফেরের কোনো ভালো কাজই উপকারে আসবে না, আয়াতে এসেছে,
﴿ وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٖ فَجَعَلۡنَٰهُ هَبَآءٗ مَّنثُورًا ٢٣ ﴾ [الفرقان: ٢٢]
“আর আমরা তাদের কৃতকর্মের প্রতি অগ্রসর হয়ে সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।” [ফুরক্বান: ২২]
বরং সে তো তার সওয়াব দুনিয়ায় পেয়ে যাবে।

৫. তারা বলে, অনুষ্ঠান যদি রবিউল আউয়ালের বারো তারিখ, রবিউল আউয়াল মাস ও কোনো নিদিষ্ট সময়ে না থাকে এবং অন্য কোনো সময় সংঘটিত হয় তবেও এতে উদযাপনকারীর কোনো সমস্যা নেই।
জবাব:
এই ব্যাপারটি বাতিল এবং কথাটি প্রত্যাখ্যাত। কেননা ইবাদত ও শরীয়ত মূলত নিধারিত; এতে আল্লাহর জন্য নিদিষ্ট কোনো ইবাদত ও কর্মপ্রণালী করা যাবে না যা শরীয়তে বর্ণিত নেই, যদিও তা হয় আল্লাহর যিকর অথবা রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালামের জীবনী পড়া ইত্যাদি। বাস্তবতায় দেখা যায়, এই ধরণের মিলাদ এবং জলসা সাধারণত রবিউল আউয়াল মাসেই হয়ে থাকে এবং এগুলোকে এদিকেই ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়।

৬. মিলাদ অনুষ্ঠানে নবীর শানে যিকর, সদকা, তার প্রশংসা ও মর্যাদা বর্ণনা করা হয়; এগুলো তো শরীয়তে কাম্য ও প্রশংসিত আর এ ব্যাপারে তো সহীহ হাদীস এসেছে ও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
জবাব:
হ্যাঁ, আল্লাহর যিকর-সদকাসহ আরও অন্যান্য বিষয়ে হাদীস এসেছে কিন্তু এই ধরণের নির্দিষ্ট আকারে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সমাবেশ করার পছন্দনীয়তা বর্ণিত হয় নি। আর এই রাতে এমন কোনো দোআ-যিকর পাঠ করতে উৎসাহিত করা হয় নি যেগুলো শরীয়তের মূলে নেই এবং যার সপক্ষে ওহীর কোনো দলীলে নেই অথবা (উৎসাহিত করা হয় নি) ঐসব কবিতা পাঠ করতে যেগুলো বাড়াবাড়ি ও ভূয়ামিতে পরিপূর্ণ।

৭. এক ব্যক্তি সোমবার রোযা রাখা সম্পকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন,
«فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَيَّ»
এ দিন আমার জন্ম হয়েছে এবং এতেই আমার উপর নাযিল করা হয়েছে।”
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম সোমবার হওয়ায় তিনি এই দিনকে সম্মানিত করেছেন। তাই তারা তাঁর জন্মদিন রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখকে অনুষ্ঠান উদযাপন ও সম্মান করার মাধ্যমে নির্ধারিত করে নিল।
জবাব:
কাম্য হলো প্রতি সপ্তাহের সোমবার সাওম পালন করা —এর থেকে বেশি কিছু নয়— আর এটিকে কোনো মাস অথবা সপ্তাহের জন্য নির্দিষ্ট না করা। কারণ সোমবারকে কোনো তারিখে নির্দিষ্ট না করে শর্তহীনভাবে সাওম পালন করার দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কাজের মিল ঘটে। অথচ তারা এ দিনকে বছরের রবিউল আউয়াল মাসের এক দিন নির্দিষ্ট করে রেখেছে।
এর সাথে আরও বলা যায়, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওসীয়তকে সম্মান করে না, এর ফযীলত থাকা সত্ত্বেও; যেহেতু এ দিনেই বান্দার আমল আল্লাহর নিকট পেশ করা হয় এবং এ অবস্থায় বান্দার সাওম পালনরত থাকা উত্তম। কিন্তু তারা এ দিনকে নিকৃষ্টভাবে পানাহার ও আনন্দের সাথে পালন করে থাকে।
তাছাড়া আপনি তো আরও জানেন যে, ইবাদতসমূহ (কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য দ্বারা) নির্ধারিত; তাই কোনো দিনকে নির্দিষ্ট ইবাদত ও ভালকাজের জন্য নির্দিষ্ট করার জন্য শর‘য়ী দলীলের প্রয়োজন কিন্তু পূর্বেই গত হয়েছে যে, এই বিদ‘আতের উপর কোনো দলীল নেই।
আর ভুলে যাবেন না যে আমরা পূর্বেই বলেছি, রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুদিবস এবং সলফ তথা সত্যান্বেষী আলেমদের প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী ওহী নাযিল বন্ধ হওয়ার দিন। সুতরাং, আপনার রবের কসম খেয়ে বলুন তো, আমরা কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত্যু উপলক্ষে অনুষ্ঠান করি নাকি জন্ম উপলক্ষে?! আর এ দুটির মধ্যে সমন্বয় সাধন কি সম্ভব?!

Share this Post
Scroll to Top