সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং স্রষ্টার নিকট প্রত্যাবর্তন

সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং স্রষ্টার নিকট প্রত্যাবর্তন

Purpose-Creation-Saleh-As-Saleh

সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং স্রষ্টার নিকট প্রত্যাবর্তন

ডঃ সলেহ আস সলেহ প্রণীত ও “Daar Al-Bukhari” কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত “The Purpose Behind Creation And Return to the Creator” এর ২৭ পৃষ্ঠার মধ্যে প্রথম ১৫ পৃষঠা অনূদিত।

ভূমিকাঃ

মানুষের সহজাত প্রকৃতি (ফিতরা) সহজেই চিনতে পারে কোনটি ভালো এবং কোনটি মন্দ।

উদ্দেশ্য এবং প্রত্যাবর্তনঃ

আল্লাহ (c) মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষ তার অধীন। তিনি এই প্রত্যাদেশ করেছেন যে প্রত্যেক মানুষ অবশ্যই একদিন মৃত্যুবরণ করবে এবং তাঁর নিকট ফিরে যাবে। এই দুনিয়াবী জীবন একটি মধ্যবর্তী ক্ষণ মাত্র। আল্লাহ (c) চান মানুষ তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গঠণ করুক। এটিই ইবাদতের মর্ম। ইবাদতের জন্য জরুরী নিরংকুশ আত্মসমর্পণ, বিনয় এবং ভালোবাসা আর এ সবই একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি জান্নাতে অনন্ত জীবনের অঙ্গীকার করেছেন তাদের জন্য যারা আনুগত্যের সাথে একমাত্র তাঁর ইবাদত করবে; এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামের অঙ্গীকার করেছেন তাদের জন্য যারা তাঁর আদেশকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লাহ (c) বলেন, “সেদিন চূড়ান্ত বাদশাহী হবে একমাত্র আল্লাহতা’য়ালার।  তিনি সবার মাঝে ফায়সালা করবেন। অতঃপর যারা ঈমান এনেছে ও নেক কাজ করেছে তারা নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে অবস্থান করবে।“ (২২:৫৬)

“আর যারা অস্বীকার করবে এবং আমার আয়াত সমূহ মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে, তারা জাহান্নামের বাসিন্দা হবে, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।” (২:৩৯)

মানুষ তার জীবনে কৃষক, গাড়ী ব্যবসায়ী, ইলেকট্রিশিয়ান, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, প্রেসিডেন্ট, কোম্পানীর প্রধান নির্বাহী, যা-ই হোক না কেন আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা ব্যতীত তার গত্যন্তর নাই। কি ভালো আর কি মন্দ তা নির্ধারণ করার তিনিই একক ক্ষমতাবান। তিনি বলেনঃ “পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যে ব্যক্তিই কোন নেক কাজ করবে এমতাবস্থায় যে সে হবে যথার্থ মুমিন, তাহলে অবশ্যই তাকে আমি দুনিয়ার বুকে পবিত্র জীবন যাপন করাবো এবং আখিরাতের জীবনেও তাদের দুনিয়ার জীবনের কাজকর্মের উত্তম বিনিময় দান করবো।” (১৬:৯৭)

নাযিলকৃত প্রত্যাদেশে বিস্তারিত রয়েছে কি ভালো আর কি মন্দ। ইহা ছেড়ে দেওয়া হয় নাই সীমিত প্রকৃতির কিছু মানুষের জন্য যারা নির্ধারণ করবে কি ভালো এবং কি মন্দঃ

“… আমি তোমাদের উপর কিতাব নাযিল করেছি, মুসলমানদের জন্য এই কিতাব হচ্ছে সব কিছুর ব্যাখ্যা, হিদায়াত ও মুসলমানদের জন্য সুসংবাদস্বরুপ” (১৬:৮৯)

“… মূলতঃ আইন বিধান জারি করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহতা’য়ালারই; আর তিনি আদেশ দিচ্ছেন, তোমরা আল্লাহতায়ালা ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবেনা; কারণ এটাই হচ্ছে সঠিক জীবন বিধান, কিন্তু মানুষের অধিকাংশই জানেনা।” (১২:৪০)

আল্লাহতায়ালা এটা পরিষ্কার করে বলেছেনঃ “যে কোন ব্যক্তিই কোন নেক কাজ করবে, সে তা করবে তার নিজের জন্য; আর যে ব্যক্তি কোন মন্দ কাজ করবে, তা তার উপরই গিয়ে পড়বে। তোমার মালিক তার বান্দাদের ব্যাপারে কখনও যালিম নন।” (৪১:৪৬)

মহাসাফল্য অর্জিত হবে তখনই যখন বান্দা তারই জন্য তার রব প্রদত্ত জীবন বিধান পরিপূর্ণ অনুসরণ করে। আল্লাহ c বলেনঃ “আমি মানুষ এবং জ্বীন জাতিকে আমার ইবাদাত করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি।” (৫১:৫৬)

ইসলামের এই শাশ্বত বাণী মানুষের মধ্যে ফিতরা (সহজাত প্রবৃত্তি) হিসেবে প্রদত্ত। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সর্বোত্তম আকৃতিতে। তিনি cপরকাল (অদৃশ্য) কে বিশ্বাস করার ফিতরা (সহজাত গুণ) দিয়েছেন। পশুপাখী তাদের ইন্দ্রিয়ের অবকাঠামোর মধ্যেই জীবনযাপন করে যেখানে মানুষ আরও বিস্তৃত সৃষ্টি পরিকল্পনার সাথে নিজের সম্বন্ধ তৈরী করতে পারে। মানুষের আত্মা ও তার পরিধি পশু-পাখীর আত্মার চেয়ে অধিক বিস্তৃত ও উন্মুক্ত। মানুষ জানে যে তড়িৎপ্রবাহ ইলেকট্রন নামক ক্ষুদ্র কণিকার সমষ্টি। অথচ আমরা এই কণিকাগুলো দেখতে পাইনা, এর কেবল প্রতিফল আমরা দেখি তড়িৎ তরঙ্গ আকারে অসিলোস্কোপ (Oscilloscope) নামক যন্ত্রে। প্রকৃতির মাঝে ও আমাদের নিজেদের মাঝে সর্বত্র আমরা আল্লাহর c নিদর্শণ দেখতে পাই, অতএব আমাদের অবশ্যই আল্লাহর সাথে সম্বন্ধ তৈরী করতে হবে ঠিক সেভাবে যেভাবে তিনি পছন্দ করেছেন। এটিই হলো আমাদের উপর তাঁর অধিকার: ইবাদত হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য।

মুয়াজ ইবনু জাবাল h থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একসময় নবী করীম g এর বাহনের পিছে বসা ছিলাম। আমার ও নবী করীম g এর মাঝে কাঠ ছাড়া আর কোন ব্যবধান ছিল না। নবী করীম g বললেন, হে মু’আয ইবনু জাবাল! আমি বললাম ইয়া রাসুলুল্লাহ! g বান্দা হাযির; আপনার আনুগত্য শিরোধার্য !তারপর তিনি কিছুদুর অগ্রসর হয়ে আবার বললেন,হে মু’আয ইবনু জাবাল !আমি বললাম, বান্দা আপনার খেদমতে হাযির, আপনার আনুগত্য শিরোধার্য, হে আল্লাহর রাসুল !তারপর তিনি কিছুদুরে আগ্রসর হয়ে আবার বললেন, হে মু’আয ইবনু জাবাল !আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! বান্দা আপনার খেদমতে হাযির, আপনার আনুগত্য শিরোধার্য । তিনি বললেন, তুমি কি জান বান্দার উপর আল্লাহ তায়ালার কী হক রয়েছে? আমি আরয করলাম, আল্লাহ এবং তার রাসুলই তা ভাল জানেন। নবী করীম g বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক এই যে, তারা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না । তারপর কিছুদুর চললেন । নবী করীম g আবার বললেন, হে মু’আয ইবনু জাবাল । আমি আরয করলাম, বান্দা আপনার খেদমতে হাযির, আপনার আনুগত্য শিরোধার্য, হে আল্লাহর রাসুল! নবী করীম g বললেন, তুমি কি জান,এগুলো করলে আল্লাহর কাছে বান্দার কী হক আছে ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভাল জানেন। নবী করীম g বললেন, বললেন,আল্লাহ তায়ালা তাকে শাস্তি দিবেন না ।

[অধ্যায়:- কিতাবুল ঈমান | অনুচ্ছেদ:- যে ব্যক্তি তাওয়াহ্‌য়ীদের উপর ইন্তিকাল করবে,সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে – এর প্রমাণ ।  সহিহ মুসলিম :: হাদিস ৪৯ । তাখরীজঃ ( ই.ফা. ৫০ , ই.সে. ৫১ )]

আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান ও বিবেক দিয়ে মানুষ অদৃশ্য ইলেকট্রনিক বলয়ে অদৃশ্য পরমানু যা বলয়ের প্রকৃতি নির্ধারণ করে তার সাথে সম্বন্ধ তৈরী করতে পারে। মানুষ তার এই সহজাত জ্ঞান দিয়ে তার স্রষ্টার সাথেও সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম। যদিও এই সহজাত জ্ঞান এই জীবনে আল্লাহকে দেখতে অক্ষম, তথাপি সত্য রবের গুণাবলী ও সৃষ্টির মাঝে তার নিদর্শণ চিনতে সক্ষম। অতপর যে কেউ সহজে অনুধাবন করতে পারে যে বান্দার প্রতি আল্লাহর সর্বসেরা পুরস্কার হলো বিচার দিবসে স্বয়ং আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ। আল্লাহকে তাঁর নাম ও গুণাবলীতে চেনা একজন বান্দাকে এই ধরণীতে তার উপস্থিতির উদ্দেশ্য পূরণে সচেষ্ট করে, যেভাবে উপরিল্লিখিত আয়াতে (৫১:৫৬) এবং এই আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ “…আইন বিধান জারি করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই; আর তিনি আদেশ দিচ্ছেন, তোমরা আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কারো গোলামী করবেনা। এটিই সঠিক জীবন বিধান, কিন্তু মানুষের অধিকাংশই জানেনা। (সূরা ইউসুফ ১২:৪০)।

আল্লাহর গুণাবলী ও সৃষ্টির মাঝে তাঁর নিদর্শণ তাঁর একত্বের সত্যায়ণ করে এবং আরও সত্যায়ণ করে যে তিনিই একমাত্র সত্য রব যিনি ইবাদতের যোগ্য। প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি তাঁর রবকে অবমূল্যায়ন করে। সে আল্লাহর যে কোন ইবাদতকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে অথবা মহান আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য যে কারো ইবাদত করতে পারে। প্রত্যাখ্যানকারীদের দলে এমন লোক রয়েছে যারা মনে করে এই মহাবিশ্ব নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়েছে অথবা কোন আকস্মিক ঘটনার ফলে অস্তিত্ব পেয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে পূরণ করার জন্য মানুষের কোন লক্ষ্য নেই কারণ তার অস্তিত্বই নির্ধারিত কোন লক্ষ্য বিহীন। ফলতঃ নৈতিক ও মূল্যবোধ প্রথা অর্থহীন হয়ে পড়ে। অনুরুপভাবে মানুষ ‘প্রকৃতি মায়ের’ জন্য সাড়া দেওয়ার ‘যন্ত্র’ বিশেষ যা, ডারউইনের মতে, লক্ষ্যহীন ক্রিয়াকলাপ করে থাকে। চিন্তার এই পন্থাই হচ্ছে লক্ষ্যহীনতা এবং এটা ঘটে যখন মানুষ সেই একক সত্বা যিনি জন্ম, মৃত্যু, এই মহাবিশ্ব, এবং চারপাশের সবকিছুই পরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছেন তাঁকে চিনতে ব্যর্থ হয়ঃ

“… আল্লাহতায়ালা প্রতিটি জিনিষের জন্যই একটি পরিমাণ ঠিক করে রেখেছেন।” (সূরা তালাক ৬৫:৩)

লক্ষ্যহীনরাই আল্লাহর নিকট মানুষের প্রয়োজন প্রত্যাখ্যান করে। আল্লাহতায়ালা তাদের কথা উল্লেখ করে কুরআনে বলেনঃ

“বস্তুতঃ বহুসংখ্যক মানু্ষ ও জ্বীন আমি জাহান্নামের জন্যই পয়দা করেছি, তাদের কাছে যদিও (বুঝার জন্য) অন্তর আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা চিন্তা করেনা; (দেখার জন্য) চোখ থাকলেও তা দিয়ে তারা (সত্য) দেখেনা; আবার শোনার জন্য কান আছে, কিন্তু সে কান দিয়ে (সত্য) শোনেনা, এরা হচ্ছে কতিপয় জন্তু-জানোয়ারের মত, বরং তাদের চেয়েও এরা বেশী পথভ্রষ্ট, এসব লোকেরা উদাসীন।” (সূরা আ’রাফ ০৭ : ১৭৯)

সৃষ্টি আল্লাহর মুখাপেক্ষীঃ

মানুষ সর্বদাই তা-ই চায় যা তার মঙ্গল করে এবং যা তাকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করে। কিন্তু এটা পেতে হলে মানুষকে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে কি কি ক্ষতিকর। কেবল তখনই সে জানতে পারবে কাকে তার প্রয়োজন, কার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং ভালোবাসতে হবে যাতে সে অর্জন করতে পারে যা কিছু মঙ্গলজনক এবং স্বস্তি বোধ করতে পারে যা কিছু সে পছন্দ করে তা নিয়ে। এই লক্ষ্য অর্জনের পথে তাকে সঠিক ও উত্তম পদ্ধতি অবলম্বন করতে জানতে হবে। তবে এজন্য তার প্রয়োজনঃ

ক) ক্ষতি সম্বন্ধে জানা

খ) এই ক্ষতি দূর করার পথ ও পদ্ধতি সমূহ জানা

যিনি সবকিছুই পরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছেন, যাঁর স্বত্ত্বা ও গুণাবলীতে কোন ঘাটতি নেই, তাঁর প্রেরিত বিধানের চেয়ে মানুষের অন্য কোন জীবন বিধান উত্তম হতে পারেনা। তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। যিনি অমুখাপেক্ষী, অশেষ ধন-ভান্ডারের অধিকারী, পরম দয়ালু ও অসীম দাতা এবং মানুষের অন্তর পরিবর্তনের মালিক, তাঁর চেয়ে উত্তম আর কে থাকতে পারে !

মানুষ তাঁর নিকট নিতান্তই দূর্বল। তিনি আল্লাহ, পরম সত্য ও একক ইলাহ। মানুষ নিজের কেবল ক্ষতিই বৃদ্ধি করতে পারে যদি সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সাহায্য প্রার্থনা করে। মহান আল্লাহ তিনি এক ও অদ্বিতীয় যিনি এককভাবে অশুভ অমঙ্গল দূর করে মানুষের সাহায্য করতে পারেন, কেননা তাঁর ইচ্ছা ও ক্ষমতা ব্যতীত কাউকে কোন অশুভ স্পর্শ করতে পারেনা।

আল্লাহ c তাঁর কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন এবং রাসূলগণ মনোনীত করেছেন যেন মানুষঃ

ক) তার রবকে চিনতে পারে ঠিক সেভাবে যেভাবে তিনি c নিজের সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন এবং

খ) তাঁর বিধান অনুযায়ী আঈবন যাপনের সাথে সাথে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে।

আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর জ্ঞান, তিনি ব্যতীত অন্য সকল কিছুর পূজা হতে মানুষকে মুক্ত করে, কেননা সৃষ্টি নিতান্তই দূর্বল এবং তার স্রষ্টা আল্লাহর c মুখাপেক্ষী। আল্লাহর সম্বন্ধে জ্ঞান মানুষকে এটা জানতে ধাবিত করে যে শেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ g এর উপর নাযিলকৃত আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন যাপনের জন্যই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই নাযিলকৃত ওয়াহীই হলো জীবনের পূর্ণাঙ্গ বিধান। মঙ্গল – অমঙ্গল ও শুভ-অশুভ সবই প্রতিষ্ঠিত যাতে মানুষ এই বিধানসমূহক কেন্দ্র করে জীবন পরিচালনা করত পারে। যদি কেউ কোন ভুল করে ফেলে এবং জানে যে আল্লাহতায়ালা পরম ক্ষমাশীল, তবে সে অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর দিকে মুখ ফিরাবে এবং কেবল তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেঃ ‘জেনে রেখো, আল্লাহতায়ালা ছাড়া দ্বিতীয় কোন মাবুদ নাই, অতএব তাঁর কাছেই নিজের গুণাহ খাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। … ’ [সূরা মুহাম্মদ ৪৭: ১৯]

এটা চিন্তা করা ও বিশ্বাস করা মারাত্মক ভুল যে আল্লাহ c তাঁর পাশাপাশি অন্য কোন ইলাহ সৃষ্টি করেছেন যাতে তাদের নিকটও সাহায্য চাইতে পারে, তাদেরকেও ভালোবাসে ও ভয় করে, ইত্যাদি। সকল জাতির তিনিই একমাত্র রব। তিনি এই নির্দেশ দান করেননি যে মানুষ তাঁর পাশাপাশি তারকা, সূর্য, আগুণ, ঈসা m অথবা মূসা m কে রব বানাবে। তাদের ভাবনা থেকে তিনি c অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁর পথ একই সরল পথ যা মানুষকে তাদের ইচ্ছা আল্লাহর নিকট সমর্পণ করতে বলে। তিনি c সকল মানুষকে, এমনকি মুহাম্মদ g কেও সতর্ক করে দেন যে যদি কেউ তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করে তবে তাদের সকল আ’মল নষ্ট হয়ে যাবে ও তারা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়বেঃ

“অথচ (হে নবী) তোমার কাছে ও সেসব (নবীদের) কাছে যারা তোমার পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে, এ (মর্মে) ওহী পাঠানো হয়েছে, যদি তুমি আল্লাহতায়ালার সাথে শরীক করো তাহলে অবশ্যই তোমার সব আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থদের শামিল হবে। অতএব তুমি একান্তভাবে আল্লাহতায়ালার ইবাদাত করো এবং শোকরগুজার বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও। ” (সূরা যুমার ৩৯:৬৫-৬৬)

জেনে নিই, মুহাম্মদ g যিনি মানুষ ও নবী, যিনি আল্লাহতায়ালাকে সর্বোত্তম জানতেন, তিনি কি বলতেনঃ

“ হে আল্লাহ! আমি তোমার অসন্তুষ্টি থেকে তোমার সন্তুষ্টির জন্য আশ্রয় চাই; তোমার শাস্তি থেকে তোমার ক্ষমার নিকট; তোমার ক্রোধ থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই; তোমার প্রশংসা ও গুণগান করার শক্তি আমার নেই। তুমি নিজে তোমার যেরূপ প্রশংসা বর্ণণা করেছ, তুমি ঠিক তদ্রুপ।”

[অধ্যায়: কিতাবুস স্বলাত | অনুচ্ছেদ: রুকু ও সিজদায় কি পাঠ করা হবে;  সহিহ মুসলিম :: হাদিস ৯৭৭] তাখরীজঃ ই.ফা. ৯৭২ , ই.সে. ৯৮৩।

“ …হে আল্লাহ! আমি আমার নিজকে তোমারই কাছে সমর্পণ করছি। আমার চেহারাকে তোমার দিকে ফিরাচ্ছি! আমার কর্ম তোমার কাছে সোপর্দ করছি। আমার নির্ভরশীলতা তোমারই প্রতি আশা ও ভয় উভয় অবস্থায়। তোমার কাছে ছাড়া আর কোথাও আশ্রয় ও মুক্তির জায়গা নেই। আমি ঈমান এনেছি তোমার কিতাবের প্রতি যা তুমি অবতীর্ণ করেছ এবং তোমার নবীর প্রতি যাঁকে তুমি প্রেরণ করেছ।…”

[অধ্যায়: তাওয়াহ্‌য়ীদ | অনুচ্ছেদ: আল্লাহর বাণী : তা তিনি জেনে শুনে নাযিল করেছেন। আর ফেরেশতারা এর সাথী। (সূরাহ আন্-নিসা ৪/১১৬) সহীহুল বুখারী :: হাদিস : ৭৪৮৮ ] তাহক্বীক:: মারফু হাদিস।         তাখরীজ :: [ বুখারীঃ তা.পা ৭৪৮৮, ২৪৭] ( আ.প্র. ৬৯৭০, ই.ফা. ৬৯৮০)

কুর’আনে আমরা পড়িঃ

“আল্লাহ মানুষের জন্য যে অনুগ্রহ দান করেন তা রোধ করার কেউই নেই আবার তিনি কোন অনুগ্রহ বন্ধ করলে তা পুনরুদ্ধার করার মত কেউ নেই। তিনি মহাপরাক্রমশালী, মহা প্রজ্ঞাময়। ” (সূরা ফাতির ৩৫:২)

কুর’আনে আরও পাইঃ

“যদি আল্লাহ তায়ালা তোমাদের কোন দুঃখ কষ্ট দেন তিনি ছাড়া অন্য কেউই নেই তা দূরীভুত করার; তিনি যদি তোমাদের কোন কল্যাণ চান তাহলে তাঁর সেই অনুগ্রহ রদ করারও কেউ নেই; তিনি তাঁর বান্দাদের যাকেই চান কল্যাণ পৌঁছান; আল্লাহ তায়ালা বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা ইউনুছ ১০:১০৭)

সুখ-দুঃখ সকল সময় সর্বাবস্থায় আল্লাহ সুবহানাতায়ালার প্রতি ফিরে আসার জন্য আমাদের অনুপ্রাণিত হওয়া উচিত।

কুর’আনে এও আছেঃ

“যদি আল্লাহতায়ালা তোমাদের সাহায্য করেন, তাহলে কোন শক্তিই তোমাদের পরাজিত করতে পারবেনা, আর তিনিই যদি তোমাদের পরিত্যাগ করেন তাহলে এমন কোন শক্তি আছে যে তোমাদের কোনরুপ সাহায্য করতে পারে! কাজেই আল্লাহর উপর যারা ঈমান আনে তাদের আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত। ” (সূরা আল-ইমরান ৩:১৬০)

অতএব কুর’আন মানুষকে সকল মিথ্যা বিষয়াদি থেকে প্রকৃত মুক্তির পথে ধাবিত করে। এটি অন্তরে শান্তি আনয়ন করে। এটি ঈমানদারগণকে কপটতা ও সকলপ্রকার অসততার বিরুদ্ধে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরুপ ধরে নেয়া যেতে পারে একজন ঈমানদার ব্যক্তি যে কর্মক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন। সে ভুল ও বেআইনী কাজ কর্মের মুখোমুখী হলে তা প্রত্যাখ্যান করতে দ্বিধা করেনা। সে জানে যে চাকরি তার জীবিকা অর্জনের একটি মাধ্যম মাত্র। যখন সে ভুল শোধরাতে ও অন্যায়ের মোকাবিলা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে, সে ভালোই জানে যে ‘আল্লাহই একমাত্র রিযিকদাতা।’ যদি সে আল্লাহর জন্য তার এই চাকরী ত্যাগ করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করবেনঃ

“… যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য পথ (বের হয়ে আসার উপায়) তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন রিযিক দান করেন যার (উৎস) সম্পর্কে তার কোন ধারণাই নেই।…” (সূরা তালাক ৬৫: ২-৩)

উপরোক্ত আয়াত হতে এটা অপরিহার্য় হয় যে মানুষ অবশ্যই নির্ভর করবে একমাত্র আল্লাহতায়ালার উপর এবং সাহায্য চাইবে একমাত্র তাঁরই নিকট। এটাও অপরিহার্য যে মানুষ আল্লাহকে অবশ্যই ভালোবাসবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও সাহায্য লাভের জন্য একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে। এটা কি সত্য নয় যে মানুষের মধ্যে যারা এই ইহকালকে ‘চূড়ান্ত গন্তব্য’ ভেবে নিয়েছে তারা দুনিয়ারই বিভিন্ন বস্তুর পূজায় মত্ত রয়েছে? লক্ষ্য করবেন তারা এসবই পেতে খুবই সতর্ক। তারা নিজেদের উপর যুলুম করে: ব্যথা-বেদনা, সংকট, টানা দুশ্চিন্তা, উন্নতির লোভের সাথে তাল মিলিয়ে ঋণের পর ঋণের জন্য ব্যংকের দিকে হাত পেতে রাখা ইত্যাদি। তারা প্রতিনিয়ত দেওলিয়া হওয়ার শংকায় ভীত। তারা তাদের চোখের সামনে কেবল দরিদ্রতাই দেখতে পায়। রাসূলুল্লাহ (g) বলেনঃ

‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে আদম সন্তান, আমার ইবাদতের জন্য তুমি ঝামেলামুক্ত হও, আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দারিদ্র ঘুচিয়ে দেব। আর যদি তা না কর, তবে তোমার হাত ব্যস্ততায় ভরে দেব এবং তোমার অভাব দূর করব না।’ [তিরমিযী : ২৬৫৪; মুসনাদ আহমদ : ৮৬৮১; ইবন মাজাহ : ৪১০৭]

এই ধরণীতে আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য জাগতিক প্রাপ্তির দাসত্ব বরণ করার চেয়ে অনেক বেশী অর্থবহ। আমাদের স্রষ্টা স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত ও নির্দেশিত জীবন বিধান থেকে উন্নততর কোন জীবনবিধান হতে পারেনা। প্রতিটা কাজ যা আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পদ্ধতিতে সম্পাদিত হয় তা-ই ইবাদাত। মানুষ উপকারভোগী আর আল্লাহতায়ালা অভাবমুক্ত :

“হে মানুষ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে অভাবগ্রস্থ, আর আল্লাহতায়ালা সম্পূর্ণ অভাবমুক্ত, (যাবতীয়) প্রশংসার মালিক।” (সূরা ফাতির ৩৫:১৫)

 

>>>>>Special Courtesy:- dararqam.com<<<<<

Share this Post
Scroll to Top