ভুলকারীর সঙ্গে শান্তশিষ্ট আচরণ

ভুলকারীর সঙ্গে শান্তশিষ্ট আচরণ                                                                                                                 **********************************

ভুল করে কেউ কিছু করে ফেললে তার উপর কঠোর ও মারমুখী না হয়ে বরং ধীরস্থিরভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে যখন তার উপর খবরদারী ও কড়াকড়ি করায় ক্ষয়ক্ষতি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিষয়টা আমরা মসজিদের মধ্যে পেশাব করে দেওয়া এক বেদুঈনের ঘটনায় নবী করীম (ছাঃ) কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ দ্বারা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি।

আনাস বিন মালিক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন,

بَيْنَمَا نَحْنُ فِى الْمَسْجِدِ مَعَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِذْ جَاءَ أَعْرَابِىٌّ فَقَامَ يَبُولُ فِى الْمَسْجِدِ فَقَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَهْ مَهْ. قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لاَ تُزْرِمُوهُ دَعُوهُ. فَتَرَكُوهُ حَتَّى بَالَ. ثُمَّ إِنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم دَعَاهُ فَقَالَ لَهُ إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لاَ تَصْلُحُ لِشَىْءٍ مِنْ هَذَا الْبَوْلِ وَلاَ الْقَذَرِ إِنَّمَا هِىَ لِذِكْرِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَالصَّلاَةِ وَقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ. أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم. قَالَ فَأَمَرَ رَجُلاً مِنَ الْقَوْمِ فَجَاءَ بِدَلْوٍ مِنْ مَاءٍ فَشَنَّهُ عَلَيْهِ-

‘আমরা নবী করীম (ছাঃ)-এর সাথে মসজিদে বসে ছিলাম। এমন সময় একজন বদ্দু এসে মসজিদে পেশাব করতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ বলতে লাগলেন, আরে থাম! থাম! করছ কি? কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের বললেন, তোমরা তাকে বাধা দিয়ো না বরং পেশাব করতে দাও। ফলে তারা তাকে ছেড়ে দিল। তার পেশাব করা শেষ হ’লে কিছুক্ষণ পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘এসব মসজিদ পেশাব (পায়খানা) ও ময়লা ফেলার স্থান নয়; এগুলো কেবলই আল্লাহর যিকির, ছালাত আদায় এবং কুরআন তেলাওয়াতের জন্য অথবা এমন কিছু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছিলেন। তারপর তিনি উপস্থিত একজনকে এক বালতি পানি আনতে বলেন এবং তা ঐ পেশাবের স্থানে ঢেলে দেন’।[মুসলিম হা/২৮৫; মিশকাত হা/৪৯২।] এখানে ভুলের প্রতিবিধানে নবী করীম (ছাঃ) অনুসৃত নীতি ছিল নম্রতা অবলম্বন ও কঠোরতা পরিহার।

ছহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে,

أَنَّ أَعْرَابِيًّا بَالَ فِى الْمَسْجِدِ، فَثَارَ إِلَيْهِ النَّاسُ لِيَقَعُوْا بِهِ فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم دَعُوهُ، وَأَهْرِيقُوا عَلَى بَوْلِهِ ذَنُوبًا مِنْ مَاءٍ أَوْ سَجْلاً مِنْ مَاءٍ فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ، وَلَمْ تُبْعَثُوْا مُعَسِّرِيْنَ-

‘জনৈক বদ্দু মসজিদে পেশাব করে দেয়, তখন লোকেরা তার উপর হামলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের বললেন, ওকে তোমরা ছেড়ে দাও এবং ওর পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমরা প্রেরিত হয়েছ নম্র আচরণ করতে, কঠোর আচরণের জন্য তোমাদের প্রেরণ করা হয়নি’।[বুখারী হা/২২০, ৬১২৮; ফাৎহুল বারী হা/৬১২৮।]

ছাহাবীগণ তাদের মসজিদ পবিত্র রাখার ইচ্ছায় অন্যায় কাজের বাধা দানে খুবই তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। এতদসংক্রান্ত হাদীছের ভাষার শব্দগুলো তার সাক্ষী। যেমন فَصَاحَ بِهِ النَّاسُ ‘লোকেরা তার প্রতি চিৎকার করে উঠল’ فَثَارَ إِلَيْهِ النَّاسُ ‘লোকেরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল’ فَزَجَرَهُ النَّاسُ ‘লোকেরা তাকে গালমন্দ করতে লাগল’ فَأَسْرَعَ إِلَيْهِ النَّاسُ ‘লোকেরা তার দিকে ধেয়ে গেল’। এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ বললেন, مَهْ مَهْ ‘থাম! থাম!![ জামেউল উছূল ৭/৮৩-৮৭।]

কিন্তু নবী করীম (ছাঃ)-এর নযরে ছিল কাজের শেষ পরিণতি। এখানে দু’টো সম্ভাবনার মধ্যে বিষয়টা ঘুরপাক খাচ্ছিল। (ক) হয় লোকটাকে বাধা দেওয়া হবে (খ) নয় ছাড় দেওয়া হবে। যদি বাধা দেওয়া হয় তাহ’লে হয় তাৎক্ষণিক তার পেশাব বন্ধ হয়ে যাবে। তাতে লোকটি কষ্ট পাবে। নয় তার পেশাব বন্ধ হবে না, কিন্তু উপস্থিত জনতার ভয়ে সে ছুটোছুটি করবে; ফলে মসজিদের নানাস্থানে নাপাকী ছড়িয়ে পড়বে। অথবা লোকটার শরীর ও কাপড় পেশাবে একাকার হয়ে যাবে। ফলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে পেলেন লোকটাকে পেশাব করতে দেওয়ার মধ্যে তুলনামূলক কম ক্ষতি এবং কম অনিষ্ট। লোকটা যে খারাপ কাজ শুরু করেছে এবং মসজিদ অপবিত্র করে ফেলছে পবিত্র করার মাধ্যমে তার প্রতিবিধান করা সম্ভব। এজন্যই তিনি তাঁর ছাহাবীদের বলছিলেন, তাকে তোমরা ছেড়ে দাও। তাকে বাধা দিও না। তিনি আসলে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত যুক্তির ভিত্তিতে তাদেরকে থামতে হুকুম দিয়েছিলেন। তা হ’ল দু’টি অনিষ্টের গুরুটাকে পরিহার করে লঘুটা গ্রহণ এবং দু’টি সুবিধার বড়টাকে গ্রহণ করে ছোটটা পরিহার।

এক বর্ণনায় এসেছে, নবী করীম (ছাঃ) লোকটাকে এমন কাজ করার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে তা জিজ্ঞেস করেছিলেন। ত্বাবারাণী আল-কাবীর গ্রন্থে ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,

أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْرَابِيٌّ فَبَايَعَهُ فِي الْمَسْجِدِ، ثُمَّ انْصَرَفَ فَقَامَ فَفَحَّجَ، ثُمَّ بَالَ فَهَمَّ النَّاسُ بِهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لاَ تَقْطَعُوا عَلَى الرَّجُلِ بَوْلَهُ ثُمَّ قَالَ : أَلَسْتَ بِمُسْلِمٍ؟ قَالَ : بَلَى، قَالَ : مَا حَمَلَكَ عَلَى أَنْ بُلْتَ فِي مَسْجِدِنَا؟ قَالَ : وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا ظَنَنْتُهُ إِلاَّ صَعِيدًا مِنَ الصُّعُدَاتِ، فَبُلْتُ فِيهِ، فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِذَنُوبٍ منْ مَاءٍ فَصُبَّ عَلَى بَوْلِهِ-

‘জনৈক বদ্দু নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এল। তিনি মসজিদের মধ্যে তাকে বায়‘আত করলেন। তারপর লোকটা একটু দূরে সরে গেল এবং দু’ ঠ্যাং ছড়িয়ে গোড়ালির উপর ভর দিয়ে বসে পেশাব করে দিল। লোকেরা তার উপর তেড়ে এল। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমরা লোকটার পেশাব করায় বাধা দিয়ো না। পেশাব ফেরা হয়ে গেলে লোকটাকে তিনি বললেন, তুমি কি মুসলিম নও? সে বলল, কেন নয়? (অবশ্যই)। তিনি বললেন, তাহ’লে কেন আমাদের মসজিদে পেশাব করে দিলে? সে বলল, যিনি আপনাকে সত্য সহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমি একে আর পাঁচটা ভূমির মত সাধারণ ভূমি মনে করে পেশাব করেছি। তখন নবী করীম (ছাঃ) এক বালতি পানি আনতে হুকুম দিলেন এবং তার পেশাবের উপর ঢেলে দিলেন’।[ত্বাবারানী আল-কাবীর হা/১১৫৫২, ১১/২২০। হায়ছামী মাজমাউয যাওয়য়েদ গ্রন্থে বলেছেন, এটির বর্ণনাকারীগণ ছহীহের বর্ণনাকারীদের অন্তর্গত ২/১০; (মুসনাদে আবী ইয়া‘লা হা/২৫৫৭, সনদ জাইয়িদ।]

সংশোধনের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিজ্ঞোচিত পদক্ষেপ ঐ বদ্দুর মনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। ইবনু মাজাহর একটি বর্ণনা থেকে তা বুঝা যায়।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন,

دَخَلَ أَعْرَابِىٌّ الْمَسْجِدَ وَرَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم جَالِسٌ فَقَالَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِى وَلِمُحَمَّدٍ وَلاَ تَغْفِرْ لأَحَدٍ مَعَنَا. فَضَحِكَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَقَالَ لَقَدِ احْتَظَرْتَ وَاسِعًا. ثُمَّ وَلَّى حَتَّى إِذَا كَانَ فِى نَاحِيَةِ الْمَسْجِدِ فَشَجَ يَبُولُ. فَقَالَ الأَعْرَابِىُّ بَعْدَ أَنْ فَقِهَ فَقَامَ إِلَىَّ بِأَبِى وَأُمِّى. فَلَمْ يُؤَنِّبْ وَلَمْ يَسُبَّ. فَقَالَ : إِنَّ هَذَا الْمَسْجِدَ لاَ يُبَالُ فِيهِ وَإِنَّمَا بُنِىَ لِذِكْرِ اللَّهِ وَلِلصَّلاَةِ. ثُمَّ أَمَرَ بِسَجْلٍ مِنَ مَاءٍ فَأُفْرِغَ عَلَى بَوْلِهِ-

‘এক বদ্দু মসজিদে এসে ঢুকল। নবী করীম (ছাঃ) তখন মসজিদে বসা ছিলেন। সে বলল, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ও মুহাম্মাদকে ক্ষমা কর। আমাদের সাথে আর কাউকে ক্ষমা কর না। তার কথায় নবী করীম (ছাঃ) হেসে ফেললেন এবং বললেন, তুমি একটি ব্যাপক বিষয়কে সংকীর্ণ করে দিলে। কিছুক্ষণ পর লোকটা ফিরে চলল, যখন সে মসজিদের এক কোণায় গিয়ে পৌঁছল তখন দু’পা ফাঁক করে পেশাব করতে বসল। বিষয়টি যে ভুল হয়েছে তা জানার পর বদ্দু তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বলল, আমার পিতা-মাতা রাসূলের জন্য উৎসর্গ হোক, তিনি এজন্য না আমাকে তিরস্কার করলেন, না গালাগালি করলেন। শুধু এতটুকু বললেন যে, মসজিদ তো কেবল বানানো হয়েছে আল্লাহর যিকির এবং ছালাত আদায়ের জন্য। এখানে পেশাব করার কোন সুযোগ নেই। তারপর তিনি এক বালতি পানি আনতে হুকুম দিলেন এবং তার পেশাবের উপর ঢেলে দিলেন’।[ছহীহ ইবনু মাজাহ হা/৪২৮।]

বদ্দুর এই হাদীছটির ব্যাখ্যায় ইবনু হাজার বেশ কয়টি উপকারী দিক তুলে ধরেছেন। যথা-

(ক) অজ্ঞ লোকের সঙ্গে নম্র-ভদ্র আচরণ করতে হবে, কোন রাগ না করে তাকে প্রয়োজনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। কেননা সে তো গোঁয়ার্তুমি করে এসব করেনি। বিশেষ করে যদি সে এমন শ্রেণীর হয় যার মনস্ত্তষ্টি বিধান করা একান্ত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।

(খ) এ হাদীছে নবী করীম (ছাঃ)-এর স্নেহশীলতা এবং সদাচারের পরিচয় মেলে।

(গ) নাপাক জিনিস থেকে পবিত্র থাকার মানসিকতা ছাহাবীদের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল। ফলে নবী করীম (ছাঃ)-এর উপস্থিতিতে তাঁর অনুমতি না নিয়েই তারা নিষেধ করতে দ্রুত এগিয়ে এসেছিলেন। একই সাথে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধও তাদের মনে ভালমত জায়গা করে নিয়েছিল।

(ঘ) পেশাবের বাধা দূর হওয়ার পর ছাহাবীগণ পেশাবের মত অপবিত্রতা দূর করতে দ্রুত এগিয়ে এসেছিলেন। তারা আদেশ পাওয়া মাত্রই পানি ঢেলে তা পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন।[ফাৎহুল বারী ১/২২৪-২২৫।]

Share this Post
Scroll to Top