ঈদুল ফিতর এর সংক্ষিপ্ত বিধি বিধান

ঈদুল ফিতর এর সংক্ষিপ্ত বিধি বিধান

ভূমিকা
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম আল্লাহর রাসূলের উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সকল সাহাবীর উপর।
তারপর,
আলেমগণ সবসময় শরীয়তের বিধানকে সহজ ও সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসার ব্যাপারে যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন; যাতে তারা এর দ্বার উপকৃত হতে পারে। এর কিছু নমূনা হচ্ছে, দীর্ঘ কিতাবসমূহকে সংক্ষিপ্তকরণ, গ্রন্থসমূহে ছোট আকারে উপস্থাপন, এর দ্বারা যে এ সব গ্রন্থ থেকে উপকৃত হওয়া সহজ হয়, পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ ও বিশেষ সবার মধ্যে প্রসার লাভ করে।
তাই ‘মুআসসাসাতু আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ’ তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাইলো, যাতে করে শরীয়তের বিধানকে মানুষের দোর-গোড়ায় পৌঁছাতে পারে।
আর এ কারণে ‘ঈদুল ফিতর ও সাদাকাতুল ফিতর এর সংক্ষিপ্ত বিধি বিধান’ রচনা করেছে। এতে কোনো দলীল-প্রমাণ, আলেদের ভাষ্য কিংবা মাযহাবের মতামতের সৃদৃঢ়করণের কাজ করা হয় নি। শুধু মাসআলা ও বিধি-বিধান ও কারা তা বলেছে সেটাই নির্দেশ করা হয়েছে।
এটি এ বিষয়ে একটি বড় গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত অংশ, যা অচিরেই ‘আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ’ ওয়েবসাইটে আসবে ইনশাআল্লাহ। তখন পাঠকগণ মাযহাবের বিস্তারিত তথ্য, মুহাক্কিক আলেমদের ভাষ্য, প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতের দলীল, ইত্যাদি দেখতে পাবে। যা অত্যন্ত স্পষ্ট জ্ঞান-গর্ভ, গবেষণা নীতি অনুযায়ী হবে।
আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমরা যা জেনেছি তা দ্বারা আমাদের উপকৃত করুন আর যা আমাদের উপকৃত করবে তা যেন তিনি আমাদের জানান।
ইলমী বিভাগ, মুআসসাসাতু আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ
ঈদুল ফিতরের বিধি বিধান
প্রাথমিক কথা
১। “ঈদ” এর সংজ্ঞা
আরবীতে “ঈদ” শব্দের অর্থ হচ্ছে এমন সাধারণ সম্মেলন যা বারবার ফিরে আসে; চাই তা সপ্তাহ ঘুরে ফিরে আসুক, মাস ঘুরে আসুক কিংবা বৎসরে ঘুরে।
২। ঈদুল ফিতরের সময়কাল
সকল মুসলিমের ঐকমত্যে ঈদুল ফিতরের দিনটি হচ্ছে আরবী শাওয়াল মাসের প্রথম দিন। ইবনে হাযম রহ. এ ব্যাপারে ইজমা‘ (মুসলিমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) বর্ণনা করেছেন।
৩। দুই ঈদে রোযা পালনের বিধান :
দুই ঈদের দিনে রোযা রাখা সম্পূর্ণ হারাম। ইবনে হাযম, ইবনে কুদামা ও ইমাম নববী রহ. এ ব্যাপারে ইজমা‘ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
৪। ঈদুল ফিতর প্রবর্তনে হিকমত :
মাসব্যাপী দীর্ঘ সিয়াম সাধনার পর মানুষের আনন্দ উৎসবের জন্য মহান আল্লাহ একটি দিবস নির্ধারণ করে দিয়েছেন; এ দিনটিতে সকল মুসলিম বিগত এক মাসের কষ্ট আর ক্লান্তিকে ভুলে গিয়ে সকল অন্যায় অপরাধ মার্জনা ও মহাপুরস্কার প্রাপ্তির সুসংবাদে আনন্দ ও কুশল বিনিময়ে মেতে উঠবে, বৈধ উপায়ে সুখোৎসব পালন করবে, আত্মীয় স্বজনের খোজখবর নেবে, গরিব মিসকীনকে দান খয়রাত করবে। এভাবে তারা আল্লাহ প্রদত্ত এই মহান নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করবে।
প্রথম অধ্যায়
ঈদুল ফিতরে তাকবীর উচ্চারণ
• ঈদুল ফিতরে তাকবীর দেওয়ার বিধান
মালেকী, শাফে‘ঈ এবং হাম্বলী মাযহাব মতে ঈদুল ফিতরে “তাকবীর” বলা মুস্তাহাব (উত্তম)। ইমাম নববী রহ.ও এ ব্যাপারে ইজমা‘ বর্ণনা করেছেন।
• ঈদুল ফিতরে তাকবীর উচ্চারণের সময়কাল
১। “তাকবীর”এর সূচনা
ঈদুল ফিতরের রাত্রি অর্থাৎ শাওয়াল মাসের চাঁদ দর্শন অথবা ৩০ রমযানের সূর্যাস্তের পর থেকেই তাকবীর উচ্চারণ শুরু হয়ে যাবে। এটাই শাফে‘ঈ ও হাম্বলী মাযহাবসিদ্ধ মত। ইমাম বগভী, ইবনে তাইমিয়া, ইবন বায এবং ইবন উসাইমিন-এর মতামতও তাই। আর ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিও এ ফতোয়া দিয়েছেন।
২। “তাকবীর”এর সমাপ্তিকাল
এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়েছে:
১ম মত- ইমাম যখন ঈদের নামাযের জন্য উপস্থিত হবেন, তখনই তাকবীর উচ্চারণ বন্ধ করতে হবে। মালেকী, হাম্বলী ও শাফে‘ঈ মাযহাবে বর্ণিত একটি মতামতও এরকম। ইমাম বগভী ও ইবন উসাইমিন এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
২য় মত- ঈদের খুৎবা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে তাকবীর উচ্চারণ শেষ হবে। এটাই হাম্বলী মাযহাবসিদ্ধ মত। কতিপয় শাফে‘ঈ, ইবনে তাইমিয়া ও ইবন বাযেরও এই অভিমত।
• ঈদুল ফিতরের তাকবীরকে সালাতের পরে নির্ধারিত করার বিধান
ঈদের রাতে মাগরিব ও এশার নামাযের পরমুহূর্ত এবং ঈদের নামাযের পরবর্তী মুহূর্তের জন্য তাকবীর উচ্চারণ সীমাবদ্ধ নয়। এটাই হাম্বলী মাযহাবসিদ্ধ মত। অধিকাংশ শাফে‘ঈ মতাবলম্বীদের কাছে এটাই সঠিক ফতোয়া। ইমাম নববী, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে উসাইমিন রহ. এটাকেই গ্রহণ করেছেন।
• তাকবীরের শব্দাবলী
এ ব্যাপারেও দুটি মতামত লক্ষ্য করা গেছে
১। প্রথম মত: উত্তম হচ্ছে নিম্নোক্ত শব্দগুলো পড়া –
الله أكبر الله أكبر ، لا إله إلا الله ، والله أكبر الله أكبر ، ولله الحمد
(আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা– ইলা–হা ইল্লাল্লা–হু আল্লাহু আকবার ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ)
(আল্লাহ সর্ব মহান, আল্লাহ সর্ব মহান, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, আল্লাহ সর্ব মহান, আল্লাহ সর্ব মহান, আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা..)
“আল্লাহু আকবার” বাক্যটি দু’বার করে বলবে, যেমনটি হাম্বলী মাযহাবসিদ্ধ আমল। ইবনে তাইমিয়া রহ. এটাকেই গ্রহণ করেছেন। অথবা তিনবার করে বলবে। মোটকথা, সবগুলোই বৈধ ও উত্তমপন্থা। এটাই ইবন বায ও ইবন উসাইমিন রহ. এর অভিমত।
২। দ্বিতীয় মত: ঈদুল ফিতরের দিন তাকবীর উচ্চারণের জন্য সুনির্ধারিত কোনো শব্দ বর্ণিত নয়; বরং স্বাভাবিক পন্থায় আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করতে থাকবে। আল্লাহ পাক বলেন- “… যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুণ আল্লাহ তালার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।” (সূরা বাকারা- ১৮৫)
ইমাম আহমদ ও মালেক রহ. এই মতটিকে গ্রহণ করেছেন।
• তাকবীরের নিয়মাবলী
১। জোরে ও আস্তে তাকবীর দেওয়ার বিধান:
পুরুষদের জন্য ঈদগাহের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকে স্বজোরে তাকবীর বলা সুন্নত। মালেকী, শাফে‘ঈ, হাম্বলী মাযহাবী অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের এটাই অভিমত। এটি ইমাম আবু হানিফার একটি মত, মুহাম্মদ, আবু ইউসুফের মত এবং ইমাম তাহাবী রহ. তা পছন্দ করেছেন।
২। সম্মিলিত তাকবীর দেওয়ার বিধান:
সম্মিলিত তাকবীর উচ্চারণ বিদআত। মালেকীগণ সুস্পষ্টভাবে তা বর্ণনা করেছেন। আর এটি শাতেবী রহ. এর মত। ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ফতোয়াও তাই। শাইখ ইবন বায, আলবানী ও ইবন উসাইমিন রহ. তাদের সাথে সহমত পোষণ করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়
দুই ঈদের নামায
• ঈদের নামাযের ফযিলত
ঈদের সালাতের মহা ফযিলত রয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ঈদের নামায পরিত্যাগ করেননি; এমনকি মহিলা, একান্তে বাসকারিনী ও ঋতুস্রাবওয়ালী মহিলাদেরকেও ঈদের জামাতে শরীক হতে নির্দেশ দিয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পর সাহাবায়ে কেরাম কখনোই এই সুন্নত ত্যাগ করেননি। এ থেকেই ঈদের নামাযের গুরুত্ব ও ফযিলতের বিষয়টি অনুমান করা যায়। তাছাড়া এতে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করা হয়, আল্লাহর বিধি-বিধানকে প্রকাশ ও সম্মান করা হয় এবং কল্যাণ কাজে মুসলিমদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
• ঈদের নামায প্রবর্তনের হিকমত
ঈদের জামাত ও খুৎবা পাঠের অন্যতম হিকমত হচ্ছে, কোনো সম্মেলন যেন আল্লাহর স্মরণ এবং দ্বীনের বিধি-বিধানের গুরুত্ব প্রকাশ ব্যতীত অনুষ্ঠিত না হয়। পাশাপাশি এর মাধ্যমে শরীয়তের মূল উদ্দেশ্যসমূহের একটি উদ্দেশ্য সাধিত হয়, আর তা হচ্ছে প্রত্যেক জাতির প্রয়োজন একটি মহড়া, যাতে তারা তাদের শৌর্যবীর্যের প্রদর্শনী ও সংখ্যার আধিক্য দেখাবে। এ কারণেই মুস্তাহাব হচ্ছে, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, পুরুষ-মহিলা একান্তবাসী মেয়ে ও ঋতুস্রাবওয়ালী মহিলা নির্বিশেষে সকলেই ঈদগাহে গমন করবে, যাওয়া ও আসার পথ ভিন্ন করবে; যাতে করে উভয় পথের লোকেরা মুসলিমদের ক্ষমতা দেখতে পায়।
 ঈদের নামাযের বিধান
ঈদের নামায আদায় করা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। এটাই হানাফী মাযহাবের স্বতঃসিদ্ধ মত। ইমাম শাফে‘ঈ এর প্রকাশ্য মতও তাই, তাছাড়া এটি ইমাম আহমদ রহ এর একটি বর্ণনা। অনুরূপভাবে মালেকী মাযহাবের ইবনে হাবীবের প্রকাশ্য মতও তাই। ইবনে তাইমিয়া, ইবন বায এবং ইবন উসাইমিন রহ. এটিকেই পছন্দ করেছেন।
• আদায়ের ওয়াক্ত
১। ওয়াক্তের সূচনা
সূর্য যখন আনুমানিক এক বর্শা পরিমাণ উপরে উঠে যায় তখন (অর্থাৎ প্রায় সূর্যোদয়ের পনের মিনিট পর) থেকে ঈদের নামাযের ওয়াক্ত শুরু হয়ে যায়। হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী মতাবলম্বী অধিকাংশ ফকিহের এটাই অভিমত। আর এটি শাফে‘ঈ মাযহাবের একটি দিক, যা ইমাম বাগভী পছন্দ করেছেন।
২। ওয়াক্তের সমাপ্তি
পশ্চিম দিকে সূর্য হেলার সাথে সাথে ঈদের নামাযের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী মাযহাব চতুষ্টয় একমত।

• ঈদুল ফিতরের নামায বিলম্বে আদায়
হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্যে ঈদুল ফিতরের নামায বিলম্বে আদায় করা মুস্তাহাব। ইবন কুদামা এ ব্যাপারে ইজমা‘ বর্ণনা করেছেন।
• আদায়ের স্থান
১- ঈদের সালাত মাঠে আদায় করা
মক্কা মুকাররমা ব্যতীত অন্য সকল স্থানে প্রশস্ত ও উন্মুক্ত প্রান্তরে ঈদের জামাত কায়েম করা সুন্নত। এটাই হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী মতাবলম্বী অধিকাংশ ফকিহের অভিমত। এটি শাফে‘ঈ মাযহাবের একটি দিক, ইবনুল মুনযির, ইবন হাযম ও শাওকানী তা পছন্দ করেছেন।
২- মসজিদে হারামে (মক্কা শরীফ) ঈদের নামায আদায়
উত্তম হচ্ছে, মক্কায় মসজিদে হারামে ঈদের জামাত কায়েম করা। আর এটিই মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ ফকিহের মত। আর এটিই ছিল এক বিরাট গোষ্ঠী সালাফে সালেহীনের কাজ।
• ঈদের নামাযে আযান ইকামত
ঈদের নামাযের জন্য কোন আযান বা ইকামত শরীয়ত প্রদত্ত নয়। ইবনে রুশদ, ইবনে কুদামা ও ইরাকী রহ. এ ব্যাপারে ইজমা‘ বর্ণনা করেছেন।
• ঈদের নামাযের আগে পরে নফল নামায
ঈদের নামাযের পূর্বে বা পরে কোন নফল বা সুন্নত নামায নেই। ইবনে কুদামা ও ইমাম নববী রহ. এ বিষয়ে ইজমা‘ নকল করেছেন।
• ঈদ যখন জুমাবারে হয়
ঈদের দিনটি যদি শুক্রবার হয়, তবে যে ব্যক্তি ঈদের নামায পড়ল, তার জন্য অনুমতি আছে জুমায় উপস্থিত না হয়ে যুহর আদায় করে নেয়া। কিন্তু ইমামের জন্য সে অনুমতি নেই। তবে যদি জুমা আদায়ের জন্য কোন মুসল্লি খুঁজে না পায়, তবে ইমাম যুহর আদায় করতে পারবে। এটা হাম্বলী মাযহাবের মত এবং একগুচ্ছ সালাফে সালেহীনের অভিমত। ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কায়্যিম, ইবন বায ও ইবন উসাইমিন রহ.দের অভিমতও তাই। আর ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিও এ ফতোয়া দিয়েছেন। ইমাম শাওকানীও এ মত দিয়েছেন তবে তিনি জুমা থেকে ছাড় পাওয়ার বিষয়ে ইমাম ও অন্যান্যদের মধ্যে পার্থক্য করেন নি।
 ঈদের নামাযের নিয়ম
১। রাকাতের পরমাণ
সর্বসম্মতিক্রমে ঈদের নামায দুই রাকাত। ইবনে কুদামা, ইমাম নববী ও মাওয়ারদী রহ. এ ব্যাপারে ইজমা‘ বর্ণনা করেছেন।
২। ঈদের নামাযের তাকবীরসমূহ

• অতিরিক্ত তাকবীরের বিধান
ঈদের নামাযে অতিরিক্ত তাকবীর বলা সুন্নত। এটাই মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ ফকিহের মত।

• তাকবীরের সংখ্যা
সুন্নত হচ্ছে তাকবীরে তাহরীমার পরপরই অতিরিক্ত ছয় তাকবীর বলা এবং দ্বিতীয় রাকাতে উঠার সময় তাকবীরের পরপরই আরও পাঁচ তাকবীর বলা। এটা মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের আমল। ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কায়্যিম, ইবন বায, ইবন উসাইমিন রহ. ও ফতোয় বিষয়ক স্থায়ী কমিটি এটিকেই গ্রহণ করেছেন।

• অতিরিক্ত তাকবীরের সময় হাত উঠানো
অতিরিক্ত তাকবীরের সময় হাত উঠানো সুন্নত। হানাফী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ ফকিহ এ মত পোষণ করেন। আর এটি কোনো কোনো সালফে সালেহীনেরও মত।

• অতিরিক্ত তাকবীরের পূর্বে উদ্বোধনী দোয়া (ছানা) পাঠ
সুন্নত নিয়ম হল, অতিরিক্ত তাকবীরসমূহের পূর্বে উদ্বোধনী দোয়া (ছানা) পাঠ করে নেয়া এবং অতিরিক্ত তাকবীর বলার পর তা‘আওউয (আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম) পড়ে সূরা ফাতেহা শুরু করা। এটিই হানাফী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ আলেমের মতামত।

• প্রত্যেক দুই তাকবীরের মাঝে যা বলবে
১ম মত: সুন্নত হল আল্লাহর যিকির করা। যেমনটি ইমাম শাফে‘ঈ এবং আহমদ রহ. এর মত। ইবনুল মুনযির এবং ইবনে তাইমিয়া রহ. এটিকে পছন্দ করেছেন।
২য় মত: এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বর্ণিত নেই; বরং নামাযী ব্যক্তি তাকবীরসমূহ অবিরাম বলে যাবে। এটাই হানাফী ও মালেকীদের মাযহাব। ইমাম নববী রহ. এক্ষেত্রে অধিকাংশ আলেমের প্রাধান্য বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাযম, সান‘আনী এবং ইবন উসাইমিন এটিকেই গ্রহণ করেছেন।
৩। ঈদের নামাযে ক্বেরাত প্রসংগ
ঈদের সালাতে স্বজোরে ক্বেরাত পড়া:
ঈদের সালাতে ইমাম স্বজোরে ক্বেরাত পড়বে। ইবনে কুদামা এবং ইমাম নববী রহ. এক্ষেত্রে ইজমা‘ বর্ণনা করেছেন।
ঈদের নামাযে সূরা ফাতেহার পর যে সকল সূরা পড়া সুন্নত:
সুন্নত হল, প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাতে যথাক্রমে সূরা আ‘লা এবং সূরা গাশিয়া অথবা সূরা ক্বাফ এবং সূরা ক্বামার পাঠ করা।
৪। ঈদের নামায ক্বাযা আদায়
যদি কারো ঈদের নামায ছুটে যায়, তবে কিভাবে সে এর ক্বাযা আদায় করবে, এ ব্যাপারে দু’টি মত রয়েছে:
১ম মত: ঈদের নামাযের কোন ক্বাযা নেই। এটাই হানাফী মাযহাবের মত। ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে উসাইমিন রহ. এটাকেই গ্রহণ করেছেন।
২য় মত: হুবহু দুই রাকাত উল্লেখিত তাকবীরসমূহ সহ ক্বাযা করবে। এটি মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী মাযহাবের মত।

• ঈদের জামাতে মাসবূক ব্যক্তির নামাযের বিধান
যদি কোনো মুসল্লী বিলম্বে এসে অতিরিক্ত তাকবীরসমূহ হাতছাড়া করে শুধু রাকাতে শরীক হয়, তবে ছুটে যাওয়া ঐ তাকবীরসমূহের কাযা করবে না। এটাই শাফে‘ঈ এবং হাম্বলীদের মাযহাব। ইবন বায এবং ইবন উসাইমিন রহ. এ মত পছন্দ করেছেন।
তৃতীয় অধ্যায়
ঈদের খুৎবা
• খুৎবার বিধান
হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্যে ঈদের নামাযের পর খুৎবা পাঠ করা সুন্নত।
• খুৎবার জন্য নির্দিষ্ট সময়
সকল মাযহাবের ঐকমত্যে উভয় ঈদে খুৎবা পাঠের নির্দিষ্ট সময় হচ্ছে নামাযের পরবর্তী সময়। ইবনে কুদামা ও ইবনে জুযাই এ ব্যাপারে ইজমা‘ বর্ণনা করেছেন।
• খুৎবার নিয়ম
১। খুৎবার সংখ্যা
ঈদের খুতবা দু’টি। এতে হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্য রয়েছ। ইবনে হাযম রহ. এ ব্যাপারে ইজমা‘ বর্ণনা করেছেন।
২। খুৎবায় তাকবীর উচ্চারণ
খুৎবা কি তাকবীর দিয়ে শুরু করবে? নাকি আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে??
১ম মত: মুস্তাহাব হল তাকবীর দিয়ে খুৎবার সূচনা করা। আর এতে হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্য রয়েছে।
২য় মত: আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু করা। ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কায়্যিম, ইবন বায রহ. এটাকেই গ্রহণ করেছেন; আর ইমাম শাওকানী এ মতের দিকে ঝুঁকেছেন।
• ঈদের খুৎবার বিষয়বস্তু
হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্য পোষণ করে বলেছেন যে, ঈদুল ফিতরের খুৎবায় আলোচ্য বিষয় হবে “যাকাতের ফিতরের বিধি-বিধান”।
আর ইমাম শাফে‘ঈ রহ. এক বর্ণনায় “যিকিরের তাৎপর্য”, “তাকওয়ার অসিয়ত”, “সৎকর্ম সম্পাদনে প্রতিযোগিতা” যেমন কুরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি বিষয় সংশ্লিষ্টতা থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। ইবন বায রহ. এর মতও তাই।
চতুর্থ অধ্যায়
ঈদুল ফিতরের সুন্নতসমুহ
• ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বে কিছু খাওয়া এবং সেটা বেজোড় সংখ্যক খেজুর হওয়া।
সকল মাযহাবের ঐকমত্যে ঈদুল ফিতরের দিন নামাযের উদ্দেশ্যে ঘর ত্যাগ করার পূর্বে কিছু খেয়ে নেওয়া, বেজোড় সংখ্যা পরিমাণ খেজুর বক্ষন করা মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্য রয়েছে।
• প্রত্যুষে গমন করা
মুক্তাদীগণের জন্য সুন্নাত হচ্ছে, ফজরের পরপরই (বিলম্ব না করে) ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়া যাওয়া। যেমনটি শাফে‘ঈ ও হাম্বলীগণ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন।
• ওয়াক্ত না হওয়া পর্যন্ত ইমাম বিলম্ব করবেন
ইমামের জন্য মুস্তাহাব তথা উত্তম হচ্ছে, ঈদের নামাযের ওয়াক্ত হওয়া পর্যন্ত দেরী করে গমন করা, যাতে তিনি গিয়েই লোকদের নিয়ে ঈদের সালাত আদায় করতে পারেন। শাফে‘ঈ, হাম্বলীগণ এটা স্পষ্ট বলেছেন। আর ইমাম মালেক রহ.ও এ মতটি সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন।
• ঈদগাহে পদব্রজে গমন করা
হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্যে পায়ে হেটে ঈদগাহে গমন করা মুস্তাহাব। আর এটি এক বিরাট গোষ্ঠী সালাফে সালেহীনের মত।
• এক পথে গমন, অন্য পথে প্রস্থান
হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্যে ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথে গমন করা এবং ভিন্ন পথে প্রত্যাবর্তন করা সুন্নত।
• ঈদের দিন গোসল করা
ঈদের দিন গোসল করা সুন্নত। ইবনে আব্দিল বার, ইবনে রুশদ ও ইমাম নববী রহ. এ ব্যাপারে ইজমা‘ বর্ণনা করেছেন।
• সুঅবয়ব ও উত্তম পোশাকে বের হওয়া
হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্যে ঈদগাহের উদ্দেশ্যে পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাকে বের হওয়া মুস্তাহাব।
• সুগন্ধি ব্যবহার করা
হানাফী, মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী চার মাযহাবের ঐকমত্যে পুরুষদের জন্য ঈদগাহে বের হওয়ার পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত।
• ঈদের দিন পরস্পর ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকুম’ বলে কুশল বিনিময়:
ঈদের দিন পারস্পরিক ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকুম’ বলে কুশল বিনিময় করাতে কোনো সমস্যা নেই। এটি হানাফী, মালেকী, হাম্বলী মাযহাব এবং কোনো কোনো শাফে‘ঈ এর মত।
• কবর যিয়ারত
কবর যিয়ারতকে শুধু ঈদ দিবসের সাথে নির্দিষ্ট করা নতুন আবিস্কৃত বিদআত। ইবনে তাইমিয়া, ইবন বায, আলবানী ও ইবন উসাইমিন রহ. এমত প্রদান করেছেন। আর ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিও তা অনুসারে ফতোয়া দিয়েছেন।
                                                                                       সমাপ্ত
_________________________________________________________________________________
গবেষণা বিভাগ, ‘দুরারুস সানিয়্যা ফাউণ্ডেশন’
অনুবাদক: উমাইর লুৎফর রহমান
সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
সূত্র: www.dorar.net হাদীস বিষয়ক ওয়েবসাইট – ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব
Share this Post
Scroll to Top