মুসলিম চরিত্রে রমযানের কাঙ্খিত প্রভাব

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

রমযানের গুরুত্ব:
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “রমযানের আগমনে জান্নাতের দরজাগুলোকে খুলে দেয়া হয়”। রমযানে অধিক পরিমাণে ভাল কাজ করে জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়া যায়। রমযানে সিয়াম পালনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করিয়ে নেয়ার চমৎকার সুযোগ আসে। আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে উদ্ধৃত করেছেন:

“যে রমযানে বিশুদ্ধ বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের আশায় সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন।”

তেমনি তিনি (সা:) বলেছেন: ঈমান সহকারে রমযানে রাতে যে কিয়াম করবে (রাতে সালাত আদায় করবে), তার অতীতের সমস্ত গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেবেন। একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মিম্বরে ওঠার সময় তিনবার আমিন বলেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যাখ্যা করেন, জিবরীল (আঃ) এঁর তিনটি প্রার্থনার উত্তরে তিনি আমিন বলেন। তার মধ্যে একটি দুআ ছিল, যার ওপর রমযান আসে এবং চলে যায় অথচ তার গুনাহ মাফ হয় না, সে ক্ষতিগ্রস্ত/লাঞ্চিত হোক। বিশুদ্ধ নিয়তে সিয়াম পালন করলে মন্দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার আত্মিক শক্তি অর্জিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “রোযা ঢাল স্বরুপ”. একান্তভাবে আলল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য রোযা পালনকারীর জন্য বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। একটি হাদীসে কুদসীতে এসেছে আল্লাহ বলেন:

“আদম সন্তানের সকল কাজই তার নিজের জন্য, সিয়াম ব্যতীত। এটা শুধুই আমার জন্য, এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।”

রমযানের এইরূপ মর্যাদার প্রধান কারণ হচ্ছে এই মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ এবং পৃথিবীতে বিদ্যমান একমাত্র অপরিবর্তিত কিতাব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন:

“রমযান মাস সেই মাস, যে মাসে মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ স্বরুপ কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এতে রয়েছে সত্য পথ প্রদর্শনের জন্য বিশুদ্ধ শিক্ষা এবং (সত্য থেকে মিথ্যাকে পার্থক্য করার) মানদন্ড।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২:১৮৫)

কুরআন নাযিল মানবজাতির প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সর্ববৃহৎ অনুগ্রহ, যে মানবজাতি এর পূর্ববর্তী ওহী নাযিল হওয়ার পরবর্তী সময় থেকে নিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। তাঁর দয়া নিঃসৃত এই অনুপম অনুগ্রহ ছাড়া হেদায়েতের স্তিমিত-প্রায় আলোটুকুও হারিয়ে যেত এবং গোটা মানবসমাজে প্রতিষ্ঠা হত অন্যায়ের রাজত্ব।

সিয়ামের উদ্দেশ্য:
রোযার মূল লক্ষ্য তাকওয়া (আল্লহ-ভীতি এবং তাঁর সম্পর্কে সচেতনতা) অর্জন। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন:

“…যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৩)

তাকওয়া সর্বোচ্চ নৈতিক গুণগুলোর একটি, তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর ক্রোধ এবং নিজের মাঝে একটি ঢাল তৈরী করতে পারে। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর সমস্ত আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে সর্বদা সচেতন থাকা, অর্থাৎ হারাম পরিহার করা, মাকরূহ পরিহার করা এবং এমনকি সন্দেহের অবস্থায় হালালও পরিত্যাগ করা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেরা এটাও পরীক্ষা করে দেখেছেন যে রোযা বহুভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। যেমন এ সময় শরীরে সঞ্চিত অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ব্যবহৃত হয়। এভাবে রোযা শরীরকে সবল রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা:
বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা এবং সংযমের পরিবর্তে পরিণত হয়েছে উৎসবের মাসে! রমযানের রাতগুলি পরিণত হয় পার্টি এবং ভোজের রাত্রিতে যা কিনা কোন কোন দেশে ভোর পর্যন্ত চলে। সেখানে রাত পরিবর্তিত হয় দিনে, দিন পরিবর্তিত হয় রাতে (বহু মানুষই রোযার সময়টুকু ঘুমিয়ে কাটায়)। সাধারণতঃ সেহেরীতে মানুষ হালকা খাবারের বদলে পেট ভরে খায়। ফলে রোযা অবস্থায় খুব কম মানুষই প্রকৃত ক্ষুধার তাড়না বোধ করে। আবার ইফতারীতে আরেক দফা ভরপেট খাওয়া চলে, সেই সাথে রয়েছে রকমারী খাবারের আয়োজন। ফলে অনেকেই রমযান শেষে ওজন বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করে!

মুসলিম চরিত্রে সাওমের কাঙ্খিত প্রভাব: রমযানের শিক্ষাসমূহ
রমযানের সময়কাল অনেকটা বিদ্যালয়ের মত, যে সময়টিতে শেখার মত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোন কারণে নামায ছুটে গেলে আমরা তা পরবর্তীতে আদায় করে নিতে পারি, কিংবা রোযাও পরবর্তীতে রাখতে পারি, কিন্তু রমযানের সময়টি সেরকম নয়, এ সময় যদি পার হয়ে যায় এমন অবস্থায় যে আমরা রমযানের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গুলো নিতে পারলাম না, তবে তা বিরাট ক্ষতি।

প্রথম শিক্ষা: আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা বা তাকওয়া সৃষ্টি
কুরআনের যে আয়াতে সিয়ামের আদেশ দেয়া হয়েছে, সে আয়াতেই এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে:

“হে বিশ্বাসীগণ। তোমাদের জন্য সিয়াম পালনকে নির্ধারণ করা হল যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৩)

এই তাকওয়া আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা, তাঁর উপস্থিতির উপলব্ধি, এবং এটা জানা যে তিনি আমাদের দেখছেন – যা আমাদেরকে ব্যক্তিগত জীবনে উন্নততর মানুষ হতে সাহায্য করবে। এই তাকওয়াকে আলী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন “আল্লাহর প্রতি ভয়, অল্পে সন্তুষ্টি এবং (পরবর্তী জীবনের পানে) যাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে”। তাই ভয় তাকওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একদল লোক কেবল আল্লাহকে ভালবাসার কথা বলে থাকে এবং দাবী করে যে আল্লাহকে ভয় করে তাঁর ইবাদত করা ঠিক নয়, বরং তাঁকে শুধুমাত্র ভালবেসে ইবাদত করাটাই ঈমানের উন্নততর শর্ত । কিন্তু এ কথা ঠিক নয়। কুরআনের পাতায় পাতায় আল্লাহকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে। এই ভয়ের অর্থ তাঁর অবাধ্যতার কারণে যে শাস্তি রয়েছে, সেই শাস্তিকে ভয় করা। মানুষ আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য সাধনা করার মাধ্যমে তাকে ভালবাসবে, একই সাথে তাঁর শাস্তির ভয়ও অন্তের পোষণ করতে হবে। এ দুটো অবিচ্ছেদ্য এবং প্রকৃত ঈমানের মৌলিক দুটি উপাদান। আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, “যে রোযাদার লাইলাতুল ক্বদর লাভ করবে, তার পূর্ববর্তী পাপসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। এবং যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ঈমান সহকারে রমযানে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ সমূহকেও ক্ষমা করে দেয়া হবে“। এজন্য সিয়াম হতে হবে সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক প্রেরণার ভিত্তিতে। যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

“যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।”

রোযা অবস্থায় আমাদের দিনগুলো রোযা না রাখা অবস্থায় আমাদের দিনগুলোর মত হওয়া উচিৎ নয় – এর মাঝে পার্থক্য থাকা উচিৎ। এই তাকওয়াই মানুষকে সর্বাবস্থায় অন্যায় থেকে বিরত রাখে, যদিও বা কেউ তাকে দেখতে না পায়। তাকওয়ার অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। কুরআনের আলোকে তাকওয়ার কয়েকটি উপকারিতা হচ্ছে:

সন্তান-সন্ততির কল্যাণ: আল্লাহ পাক বলেন: “দেয়ালের ব্যাপারটি হল এই যে এটা শহরের দুজন এতিম বালকের। এর নিচে এদের কিছু সম্পদ প্রোথিত রয়েছে, আর তাদের বাবা ছিলেন একজন সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি। তাই তোমার রব চাইলেন যে তারা তাদের যৌবনে পৌঁছে যেন এই সম্পদ বের করে আনতে পারে, তাদের রবের পক্ষ থেকে করুণাস্বরুপ (সূরা আল কাহফ, ১৮ : ৮২)
আসমান এবং জমীন থেকে কল্যাণ:আল্লাহ পাক বলেন: “শহরগুলোর লোকেরা যদি কেবল ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, আমরা তাদের জন্য আসমান ও জমীন থেকে কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দিতাম।”(সূরা আল আ’রাফ, ৭ : ৯৬)
আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযিক এবং কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “যেই তাকওয়া অবলম্বন করবে, আমি তার জন্য পথ বের করে দেব এবং এমন স্থান থেকে তাকে রিযিক দেব যা তার ধারণাতেই ছিল না।” (সূরা আত তালাক্ব, ৬৫ : ২-৩)
নিরাপত্তা: আল্লাহ পাক বলেন: “এবং আমি তাদেরকে রক্ষা করলাম যারা আমার প্রতি ঈমান এনেছিল ও মুত্তাকী ছিল।”
সার্বক্ষণিক আল্লাহর সাহায্যের উপস্থিতি: আল্লাহ পাক বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন যারা তাকওয়া অবলম্বনকারী এবং সর্বদা ইহসানকারী।” (সূরা আন নাহল, ১৬ :১২৮)
বিজয়: আল্লাহ পাক বলেন: “যারাই আল্লাহ এবং তার রাসূলের আনুগত্য করে এবং আল্লাহকে ভয়ের যোগ্য হিসেবে জানে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তারাই বিজয়ী।” (সূরা আন নূর, ২৪ : ৫২)
জীবনের সুন্দর পরিসমাপ্তি: আল্লাহ পাক বলেন: “নিশ্চয়ই তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য রয়েছে সুন্দর পরিণতি।” (সূরা সোয়াদ, ৩৮ : ৪৯)
জান্নাত: আল্লাহ পাক বলেন: “এই হচ্ছে সেই জান্নাত, যা আমি আমার দাসেদের মধ্য থেকে তাদেরকে দেব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করত।” (সূরা মারইয়াম, ১৯ : ৬৩)

দ্বিতীয় শিক্ষা: আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করা
বিভিন্ন ধরনের ইবাদত প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাথে আমাদের বন্ধন প্রতিষ্ঠার উপায়। রমযানে এই ইবাদতগুলো পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, যেন আমরা এই মাস শেষে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের উচ্চতর স্তরে অবস্থান করতে পারি। খাদ্য ও পানীয় দেহের পুষ্টির উৎস, মনের খাদ্য হচ্ছে জ্ঞান, আর অন্তেরর প্রয়োজন হচ্ছে ঈমান এবং আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা। রমযানে অধিক ইবাদতের দ্বারা আমরা ইবাদতকে আমাদের জীবনের মৌলিক কাঠামো হিসেবে গ্রহণের শিক্ষা পাই। কুরআনে যেমনটি বলা হচ্ছে:

“…নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার ত্যাগ, আমার জীবন-মরণ, জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।”(সূরা আল আনআম, ৬:১৬২)

এরকমই হচ্ছে একজন প্রকৃত মুসলিমের জীবন। রমযানে বেশী বেশী কুরআন তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য এক মাসে কুরআন ‘খতম’ করা নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর বাণীর সাথে আমাদের সম্পর্ক গভীরতর করা, যদি কুরআনের বাণী আমাদের অন্তেরে স্থান করে নিতে পারে, তবে তা আমাদের জীবনকে আমূল পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে। অধিক পরিমান কুরআন তিলাওয়াৎ শোনার আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে শয়তানের কুরআন থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া। শয়তানের কুরআন [আরবী পরিভাষায় কুরান অর্থ হচ্ছে তিলাওয়াৎ, এখানে ভাষাগত অর্থটিকে ইংগিত করা হয়েছে] হচ্ছে গান-বাজনা, গল্প-উপন্যাস, সিনেমা-নাটক ইত্যাদি যেগুলো আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে না, এগুলো আমাদেরকে আনন্দ দান করলেও আল্লাহ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে নেয়। তাই রমযানে আল্লাহর কুরআনের নিকটবর্তী হওয়া এবং শয়তানের কুরআন থেকে দূরবর্তী হওয়ার দ্বিমুখী সাধনা চালাতে হবে। রমযানে বেশী বেশী করে আমরা রাতের নফল সালাত আদায় করি, যেন রমযানের পরও তা আমাদের অভ্যাস হিসেবে থেকে যায়, কেননা সমস্ত সালাতের ভিতর রাতের সালাতই সবচেয়ে একনিষ্ঠভাবে আদায় করা সম্ভব, যখন কেউ আমাদের দেখতে পায় না, এই একনিষ্ঠতা অন্যান্য সালাতে অর্জন করা খুবই কষ্টসাধ্য। তেমনি এ মাসে ধার্মিক লোকদের সাহচর্য বৃদ্ধি পায়, আমরা রোযাদারদের সাথে বসে একত্রে ইফতার করি, এবং রোযাদারেরা একে অপরকে ইফতারের দাওয়াত দিয়ে থাকে। আমাদের উচিৎ এ মাসে বেশী বেশী করে আল্লাহভীরু, ধার্মিক লোকদের সাহচর্য লাভে সচেষ্ট হওয়া, বেশী বেশী করে সে সব স্থানে যাওয়া, যেখানে জ্ঞানের কথা আলোচিত হয়।

তৃতীয় শিক্ষা: সবর এবং ইচ্ছাশক্তি
যদিও মুসলিম সমাজে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতির রোযায় সবর ও ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন নেই। কেননা ইফতার এবং সেহরীতে পেটভরে খেয়ে এবং সারাদিন ঘুমিয়ে কাটালে তাতে বিশেষ কষ্টের কিছু নেই। এতে কেবল দৈনন্দিন রুটিন পরিবর্তিত হয়ে রাত পরিণত হয় দিনে আর দিন রাতে। পারিভাষিক অর্থে একে রোযা বলে সংজ্ঞায়িত করা গেলেও এটা প্রকৃত সিয়াম নয়। এধরনের সিয়াম সবর করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না। এতে সেই সবর অর্জিত হবে না, যেই সবর এই জীবনের পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমনটি আল্লাহ সূরা আল আসরে বর্ণনা করেছেন:

“সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই সকল মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তারা ব্যতীত, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, এবং পরস্পরকে সত্যের প্রতি আহবান জানায় এবং পরস্পরকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়।” (সূরা আল আসর, ১০৩:১-৩)

এখানে বলা হচ্ছে সবর সাফল্যের চাবিকাঠি। এবং প্রকৃত সবরকারীর প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত।

চতুর্থ শিক্ষা: রিয়া থেকে বাঁচা
রিয়া অত্যন্ত ভয়ানক ব্যাপার। যদি আমরা অন্যদের দেখানোর জন্য আমল করি, তবে বাহ্যত একে উত্তম আমল বলে গণ্য করা হলেও আমাদের সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যেতে পারে এই রিয়ার কারণে। রাসূল (সা) বলেছেন,

“তোমাদের জন্য আমি যা সবচেয়ে বেশী ভয় করি, তা হল ছোট শিরক বা শিরক আল আসগার।” সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, ছোট শিরক কি?” তিনি উত্তর দিলেন, “রিয়া (লোক দেখানোর জন্য কাজ করা), নিশ্চয়ই আল্লাহ পুনরুত্থান দিবসে প্রতিদান দেওয়ার সময় লোকদের বলবেন, ‘পার্থিব জীবনে যাদেরকে দেখানোর জন্য তোমরা কাজ করেছিলে, তাদের কাছে যাও এবং দেখ তাদের কাছ থেকে কিছু আদায় করতে পার কিনা।’” (আহমাদ, বায়হাকী)। ইবন আব্বাস (রা) এ সম্পর্কে বলেন, “কোন চন্দ্রবিহীন মধ্যরাতের অন্ধকারে কালো পাথরের উপর কালো পিঁপড়ার চুপিসারে চলার চেয়েও গোপন হচ্ছে রিয়া।” (ইবন আবী হাতিম)। রোযার মাধ্যমে প্রতিটি কাজ বিশুদ্ধভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করার শিক্ষা হয়, কেননা প্রকৃত সিয়াম অন্যকে দেখানোর জন্য হওয়া সম্ভব নয়। কারণ সিয়ামের বিষয়টি বাহ্যিকভাবে দেখা যায় না। একটি হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ বলেন: “আদম সন্তানের সকল কাজই তার নিজের জন্য, সিয়াম ব্যতীত। এটা শুধুই আমার জন্য, এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।”

পঞ্চম শিক্ষা: নৈতিক চরিত্র গঠন
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” এ মাসে আমরা অধিক ভাল কাজ করার এবং খারাপ কাজ থেকে অধিক পরিমাণে বিরত থাকার চেষ্টা করি। আমরা খারাপ কথা ও কাজ পরিহার করি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেছেন: “তোমাদের কেউ রোযা অবস্থায় যেন অশ্লীল কাজ ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকে, এবং যদি কেউ কোন অশ্লীল কথা শুরু করে কিংবা তর্ক করতে আসে, তবে সে যেন তাকে বলে: ‘আমি রোযাদার।’” তেমনি আমাদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে আনার শিক্ষা হয় এই রমযান মাসে। তাই সিয়াম আমাদের চোখ, কান, হাত ও জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার মাধ্যমে আমাদের নৈতিক চরিত্রে উন্নতি ঘটায়। আমরা যদি রোযা রেখেও হারাম কথা, কাজ কিংবা হারাম দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত বন্ধ না করি, তবে এই সিয়াম আমাদের নেক কাজের পাল্লায় যোগ না হয়ে যোগ হবে অন্যায়ের পাল্লায়, যার জন্য কিয়ামতের দিন আমাদের শাস্তি পেতে হবে।

ষষ্ঠ শিক্ষা: এটা উপলব্ধি করা যে পরিবর্তন সম্ভব
আমরা যখন বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকাই, আমরা সর্বত্র দেখতে পাই নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিদাত, শিরক প্রভৃতির প্রাচুর্য, মুসলিমরা ইসলাম থেকে এতই দূরে, যে কারও পক্ষে ‘কোন আশা নেই’ এ কথা বলে বসা অসম্ভব নয়। এ অবস্থার যেন ক্রমাবনতি ঘটছে। এর সমাধান হচ্ছে মুসলিমদেরকে পরিবর্তন হতে হবে, কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? রমযান আমাদের বলছে যে এটা সম্ভব। আমরা রমযানের ফজরে দেখতে পাই মসজিদ পরিপূর্ণ, অথচ অন্যান্য মাসে তা ফাঁকা থাকে। যদিও এদের মাঝে কিছু লোক কেবল “রমযান মুসলিম”, কিন্তু অনেকেই প্রকৃত ঈমানদার, যারা রমযানে সচেতন হয়ে ওঠে। তেমনি কুরআনের ওপর জমে থাকা ধূলো সরে যায়, এবং কুরআন বেশী বেশী করে তিলাওয়াৎ করা হয়। তেমনি মানুষের চরিত্রেও পরিবর্তন দেখা যায়। হয়ত ঝগড়াটে কোন ব্যক্তি এ মাসে নিজেকে সংযত করতে শেখে। তেমনি অনেক খারাপ কাজ যা অন্য মাসে ত্যাগ করা সম্ভব হয় না, তা এই মাসে সম্ভব হয়, যেমন অনেকে ধূমপান ত্যাগ করে থাকে। তাই রমযান আমাদের শেখায় যে মুসলিমরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে সক্ষম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এজন্য জিহাদকে রমযানের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমাদের নফসের বিরুদ্ধে, পরিবারে, সমাজে ও বিশ্বে অবস্থিত সকল কু-শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে। একমাত্র এভাবেই পরিবর্তন আসা সম্ভব।

সপ্তম শিক্ষা: নিয়ন্ত্রণ
ক্ষুধা এবং যৌন বাসনা মানুষের চরিত্রে সবচেয়ে প্রবল দুটি বাসনা। এগুলোর ফলে মানুষ বহু বড় বড় পাপকাজে জড়িয়ে পড়ে। রোযা যেহেতু খাদ্য, পানীয় এবং যৌনাচার থেকে সংযম, তাই এর মাধ্যমে রোযাদারের আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন হয়। প্রকৃতপক্ষে রোযার শিক্ষা অর্জিত হয়েছে কিনা, তা বোঝার মুহূর্তটি হচ্ছে রোযা ভাঙ্গার মুহূর্ত। কেননা এসময় টেবিলে যাবতীয় মজাদার খাবার সাজানো থাকে, তাই রোযা ভেঙ্গেই মুখে প্রচুর পরিমাণে খাবার পোরার ইচ্ছে হয়, কিন্তু একজন মুমিনকে এসময় সংযত থাকতে হবে এবং নামাযের আগে হালকা কিছু মুখে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) তিনটি খেজুর এবং পানি দিয়ে রোযা ভাঙতেন, এবং মাগরিবের নামাযের পর, মাঝারি খাবার খেতেন। আত্মিক সংযমও রোযার লক্ষ্য। কেবল খাদ্য, পানীয় ইত্যাদিই নয়, রোযাদারকে মিথ্যা বলা, গীবত করা, দুর্নাম করা ইত্যাদি থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” তিনি (সা) আরও বলেছেন: “তোমাদের কেউ রোযা অবস্থায় যেন অশ্লীল কাজ ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকে, এবং যদি কেউ কোন অশ্লীল কথা শুরু করে কিংবা তর্ক করতে আসে, তবে সে যেন তাকে বলে: ‘আমি রোযাদার।’” তাই উপরোক্ত দিক নির্দেশনা মেনে যে রোযা রাখবে, তার নৈতিক চরিত্রে উন্নতি ঘটবে, সে অধিকতর সত্যবাদী এবং কথা ও কাজে আরও সতর্ক হবে।

অষ্টম শিক্ষা:মধ্যপন্থা
যেহেতু রোযা ভাঙার সময় একজন রোযাদার নিজেকে সংযত রাখে, ফলে তার খাদ্যাভাসে মধ্যপন্থা গড়ে ওঠে, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কে বলেছেন: “মুমিন এক পেটে, কাফির (যেন) সাত পেটে খায়।” জাবির (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, “একজনের খাদ্য দুইজনের জন্য যথেষ্ট, দুইজনের খাদ্য চারজনের জন্য যথেষ্ট।” ইবন উমার (রা) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কাউকে সঙ্গীর অনুমতি ব্যতীত খাওয়ার সময় একেকবারে দুটো করে খেজুর নিতে নিষেধ করেছেন।

নবম শিক্ষা: সহমর্মিতা
রোযা একজন মানুষকে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করায়, ফলে সে দরিদ্রের অবস্থা বুঝতে পারে। এর ফলে তার মাঝে দরিদ্রকে সহায়তা করার এবং তাদেরকে নিজ সম্পদের ভাগ দেয়ার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। আর এই চেতনার নমুনা হিসেবেই ঈদুল ফিতরের দিনে অভাবীকে নির্দিষ্ট পরিমাণে দান করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর যখন আমরা উপলব্ধি করব যে আমাদের এই কষ্ট ইচ্ছাকৃত, কিন্তু দরিদ্রদের কষ্ট অনিচ্ছাকৃত, তারা চাইলেও খেতে পায় না, তখন আমরা অধিকতর সহমর্মিতা অর্জন করতে পারব।।

Share this Post