নারীদের (মাসিক পিরিওড বা হায়েয থেকে) পবিত্রতার মাসয়ালা-মাসায়েল

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যে যিনি বিশ্ব জগতের পালনকর্তা। দরূদ ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবারবর্গ ও সমস্ত সাহাবায়ে কেরামের উপর বর্ষিত হোক।
ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে জানা প্রত্যে মুসলিম নারীর উপর কর্তব্য। বিশেষ করে ইবাদত সংক্রান্ত বিধি-বিধান। কেননা তা না জানলে চলতেই পারবে না।
ঐ বিধানগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পবিত্রতার বিধান। যার অনেক কিছুই অনেকের জানা নেই। কখনো লজ্জার কারণে বিষয়গুলো জানতে বাধাপ্রাপ্ত হয়।
নিম্নে হায়েয বা ঋতু সম্পর্কে শরীয়তের বিধি-বিধান আলোচনা করা হলঃ
হায়েয কাকে বলে? নারীর জরায়ু থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিনা কারণে প্রাকৃতিকভাবে নির্গত রক্ত স্রাবকে হায়েয বা ঋতুস্রাব বলা হয়। অতএব অসুস্থতা, আঘাত, পড়ে যাওয়া, সন্তান প্রসব ইত্যাদি কোন কারণ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে নির্গত রক্ত স্রাবই হচ্ছে হায়েয।
আল্লাহ্ বলেন, ﻭَﻳَﺴْﺄَﻟُﻮﻧَﻚَ ﻋَﻦِ ﺍﻟْﻤَﺤِﻴﺾِ ﻗُﻞْ ﻫُﻮَ ﺃَﺫًﻯ “আর তারা আপনাকে ঋতু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আপনি বলে দিন উহা অসূচী বা নাপাক বস্তু।” (সূরা বাকারাঃ ২২২)
হায়েয সম্পর্কে কিছু নিয়ম-নীতি ও মাসআলা-মাসায়েলঃ
১- স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশী কখনো কখনো হায়েয হতে পারে। তখন বেশী দিনগুলোকে হায়েযের দিন হিসেবেই গণনা করতে হবে।
যেমনঃ জনৈক নারীর হায়েয ছিল পাঁচ দিন। এটা বৃদ্ধি হয়ে সাত হয়ে যায়। তখন তার হায়েযের সময় সাত দিন বলেই গণ্য করতে হবে।
২- কখনো নির্দিষ্ট দিনের চেয়ে কম হয়। তখন ঐ কম দিনই হায়েয হিসেবে গণনা করতে হবে।
যেমনঃ জনৈক নারীর ঋতু ছিল পাঁচ দিন। তা কমে গিয়ে হয়েছে চার দিন। তখন আর অপেক্ষা করতে হবে না। তার ঋতুর সময় শেষ হয়ে গেছে।
৩- হায়েযের সময় বৃদ্ধি হয় বিশেষ কোন কারণে। যেমন জন্মনিরোধক ঔষধ সেবন করার কারণে। তখন হায়েযের সময়টা বেড়ে যায়। যেমন পূর্বে পাঁচ দিন ছিল, ঔষধ সেবন করার কারণে তা বেড়ে গিয়ে আট দিন পর্যন্ত স্রাব চলতেই থাকল। তখন তার ঋতু আট দিন হয়েছে বলেই গণ্য করতে হবে। অবশ্য সে ক্ষেত্রে মুসলিম মহিলা ডাক্তারের কাছে গিয়ে চেক করে নিশ্চিত হতে হবে যে, ঔষধ যথাস্থানে ব্যবহার করা হয়েছে এবং আঘাত, বা অন্য কোন অসুস্থতার কারণে রক্তক্ষরণ হচ্ছে না।
৪- ঋতু কখনো সময় হওয়ার পূর্বেই হয়ে যেতে পারে। যেমন কারো ঋতু মাসের শেষে হওয়ার কথা, কিন্তু তা এক সপ্তাহ বা দশদিন পূর্বেই হয়ে গেল। এ অবস্থায় তা হায়েয বলে গণ্য করতে হবে।
৫- ঋতু কখনো দেরীতে আসে। যেমন, কারো ঋতু মাসের মাঝামাঝি সময়ে হয়ে থাকে, কিন্তু দেরী হয়ে তা মাসের শেষের দিকে হল। তখন তা হয়েয হিসেবে গণ্য করতে হবে।
মূলনীতিঃ (থিউরী)
যদি একদিন একরাত পরিমাণ সময় বা তার চেয়ে অধিক সময় ধরে স্রাব নির্গত হয়, তাহলে নারী ঋতুবতী গণ্য হবে। যখনই পবিত্রতা দেখতে পাবে, তখনই পবিত্র হিসেবে নিজেকে গণ্য করবে। চাই নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশী হোক বা কম। চাই সময়ের পূর্বে হোক বা পরে। কেননা আল্লাহ বলেন, ﻭَﻳَﺴْﺄَﻟُﻮﻧَﻚَ ﻋَﻦِ ﺍﻟْﻤَﺤِﻴﺾِ ﻗُﻞْ ﻫُﻮَ ﺃَﺫًﻯ “আর তারা আপনাকে ঋতু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আপনি বলে দিন উহা অসূচী বা নাপাক বস্তু।” (সূরা বাকারাঃ ২২২)
৬- ঋতুর রক্তস্রাব কখনো চলতেই থাকে এবং লাগাতার হতেই থাকে। (এটাই অধিকাংশ নারীর ক্ষেত্রে হয়।)
যেমন, কারো পাঁচ দিন ঋতুর সময়। এই পাঁচদিন লাগাতার তার স্রাব নির্গত হতেই থাকে, তারপর সে পবিত্র হয়।
৭- আবার কখনো ঋতুর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচ্ছিন্ন ভাবে স্রাব আসে। কখনো রক্ত দেখা যায়, কখনো বন্ধ থাকে। তখন যে কয়দিন রক্ত দেখবে সে কয়দিন হায়েয বলে গণ্য করবে। যে কয়দিন বন্ধ থাকবে তা পবিত্র বলে গণ্য করবে।
যেমনঃ কারো হায়েযের সময় হচ্ছে আট দিন। কোন মাসে তার চারদিন রক্তস্রাব নির্গত হল তারপর দু’দিন বন্ধ থাকল, তারপর আবার দু’দিন দেখা গেল। তখন তার প্রথম চারদিন ঋতুর দিন, মধ্যখানে দু’দিন পবিত্রতার দিন। (অর্থাৎ এ দু’দিন সালাত সিয়াম আদায় করবে) আবার শেষের দু’দিন নিশ্চতভাবে ঋতুর দিন হিসেবে গণনা করবে। কেননা আট দিনই তার ঋতুর নির্দিষ্ট দিন। তাছাড়া মূল হচ্ছে নারীর প্রতিটি রক্ত স্রাবই হায়েয বা ঋতু বলে গণ্য করা- যতক্ষণ তার বিপরীত প্রমাণিত না হয়। এটা ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রহঃ)এর মত। কেননা আল্লাহ বলেন, ﻫُﻮَ ﺃَﺫًﻯ ﻓَﺎﻋْﺘَﺰِﻟُﻮﺍ ﺍﻟﻨِّﺴَﺎﺀَ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻤَﺤِﻴﺾِ “উহা হচ্ছে নাপাকী, অতএব সে সময় তোমরা স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাক।” (সূরা বাকারাঃ ২২২)
৮- মূলতঃ হায়েযের সময় হচ্ছে একদিন ও একরাত। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিষয়টিকে নারীদের অভ্যাসের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহর জ্ঞান অনুযায়ী ছয়দিন বা সাত দিন হায়েয হিসেবে গণনা করবে। যেমন অন্যান্য নারীদের হায়েয হয়ে থাকে।” আর সাধারণতঃ একদিন ও এক রাতের কম সময়ে কারো হায়েয হয়েছে দেখা যায় না। অতএব একদিন ও এক রাতের কম সময়ে যে স্রাব নির্গত হবে তা হায়েয বা ঋতু হিসেবে গণ্য হবে না।
এই মূলনীতির ভিত্তিতেঃ
ঋতুর নির্দিষ্ট দিন সমূহের মধ্যে যদি একদিন ও একরাত বা তার চেয়ে অধিক সময় ঋতু বন্ধ থাকে, তবে তা পবিত্রতা বলে গণ্য হবে। আর যদি একদিন ও একরাতের কম সময় ধরে স্রাব বন্ধ থাকে, তবে সে হায়েয অবস্থাতেই আছে বলে গণ্য হবে।
যেমনঃ (ক) কারো ঋতুর নির্দিষ্ট দিন হচ্ছে সাত দিন। পঞ্চম দিবসে তার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেল- ফজরের পর থেকে রাতের শেষাংশ পর্যন্ত। স্রাব এমনভাবে বন্ধ থাকে যে, যৌনাঙ্গে তুলা বা নেকড়া প্রবেশ করালে তাতে রক্তের কোন চিহ্ন দেখতে পাবে না, শুষ্কতা পাওয়া যাবে। তারপর পুনরায় ষষ্ঠ ও সপ্তম দিবসে স্রাব দেখা যায়। তখন পঞ্চম দিবস পবিত্রতার দিন বলে গণ্য হবে (সালাত আদায় করবে এবং সিয়াম পালন করবে) কেননা শুষ্কতার দ্বারা সেখানে পবিত্রতা প্রমাণিত হয়েছে। অধিকাংশ সময় এভাবেই পবিত্রতা বুঝা যায়।
(খ) হায়েযের নির্দিষ্ট সময় যদি সাত দিন হয়, কিন্তু পঞ্চম দিবসে ফজরের সময় থেকে আসর পর্যন্ত স্রাব বন্ধ ছিল। তখন সে ঋতু অবস্থাতেই আছে বলে গণ্য হবে। কেননা ঐ সময়টুকু একদিন ও একরাতের কম সময়।
৯- কখনো নির্দিষ্ট সময় অতিক্রম হওয়ার পরও রক্ত দেখা যায়। যেমন গোসল করে পবিত্র হওয়ার দু’দিন বা তার চেয়ে বেশী সময় পরে দেখা যায়। তখন মূলনীতি হচ্ছে যদি একদিন একরাত বা তার চেয়ে বেশী সময় ধরে স্রাব দেখা যায়- যেমন পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে- তবে তা হায়েয বলে গণ্য। যতক্ষণ তার বিপরীত আঘাত জনিত বা অন্য কোন কারণে রক্তক্ষরণ হচ্ছে প্রমাণিত না হবে।
যেমনঃ কোন নারীর ঋতুর নির্দিষ্ট দিন হচ্ছে চার দিন। চারদিন অতিক্রম হওয়ার পর সে পবিত্র হয়ে গেছে। কিন্তু ষষ্ঠ ও সপ্তম দিবসে আবার রক্ত দেখা যাচ্ছে। তখন ষষ্ঠ ও সপ্তম দিবসে যে রক্ত দেখেছে তা হায়েযের রক্ত বলে গণ্য করবে।
প্রশ্নঃ কিভাবে নারী বুঝবে যে এই রক্ত একদিন ও একরাতের কম সময় ধরে প্রবাহিত হবে, ফলে সেটাকে হায়েয গণ্য করবে না। অথবা তার চেয়ে বেশী সময় ধরে নির্গত হতে থাকবে, ফলে নিজেকে পবিত্র বলে গণ্য করবে?
উত্তরঃ প্রথমতঃ এই রক্ত যদি ঋতুর নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে হয় বা তার পাশাপাশি সময়ে হয়, তবে তা হায়েয হিসেবে গণ্য করবে। কেননা ওটাই আসল- যতক্ষণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে শুষ্কতা দেখা না যাবে। অনুরূপ কথা যদি জানে যে প্রতিবার ঋতু হওয়ার সময় তার এরূপ হয়ে থাকে।
দ্বিতীয়তঃ হায়েযের নির্দিষ্ট সময় অতিক্রম হয়ে পবিত্রতার সময় দেখা যায় আর সেখানে হায়েযের কোন আলামত দেখা না যায়, যেমন পিঠে ব্যাথা অনুভব করা, অথবা রক্তের রঙ ও দুর্গন্ধ থাকে না, গাঢ় প্রকৃতির নয়, অধিকাংশ সময় দুশ্চিন্তা করলে বা মানসিকতায় দুর্বলতা দেখা দিলে স্রাব এসে থাকে পরে আবার চলে যায়, তবে এসকল অবস্থায় তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু যদি সেই নির্গত রক্তের সাথে হায়েযের আলামত দেখা যায়, তবে তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে- যতক্ষণ তা হায়েযের সর্বনিম্ন সময় বরাবর না হবে।
১০- কোন মাসে যদি হায়েযের স্রাব নির্দিষ্ট সময় থেকে বেশী হয়ে যায়, তবে সেই বেশী সময়টাতে নিজেকে ঋতুবতী গণ্য করবে।
যেমনঃ ঋতুর নির্দিষ্ট সময় পাঁচ দিন ছিল। কিন্তু কোন মাসে এগার দিন পর্যন্ত স্রাব চলতে থাকল, তারপর পবিত্র হল, তাহলে এই মাসে তার ঋতুর দিন এগার বলেই গণ্য হবে।
• কিন্তু তারপরও যদি স্রাব চলতেই থাকে, হায়েযের সর্বোচ্চ সময়সীমা তথা পনের দিন পর্যন্ত। তাহলে পনের দিন হয়ে গেলে গোসল করে পবিত্র হয়ে যাবে, যদিও রক্তস্রাব চলতেই থাকে। ঐ অবস্থায় প্রত্যেক ফরয সালাতের জন্যে আলাদাভাবে ওযু করবে। আর পোষাক থেকে ইস্তেহাযার রক্তের চিহ্ন ধুয়ে ফেলবে। তখন পনের দিনের পর নির্গত রক্তকে ইস্তেহাযার রক্ত বলা হবে। এটাই জুমহূর তথা অধিকাংশ বিদ্বানের মাযহাব।
• কিন্তু যদি পরবর্তী মাস পর্যন্ত এই স্রাব চলতেই থাকে, তবে তাকে বলা হবে মুস্তাহাযা। আর যে নারীর মাসের পুরাটা সময় বা দু’এক দিন বাদে অধিকাংশ সময় সর্বদা রক্তস্রাব হতেই থাকে তাকে মুস্তাহাযা বলা হয়। তখন ইস্তেহাযা হলে বিধি-বিধান কি তা জেনে নিতে হবে।

Written by
Shykh_Abdullah_Al_Kafi

Share this Post
Scroll to Top